বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা গান ও পপসংগীতের ইতিহাসে শুভ্র দেব একটি পরিচিত ও উজ্জ্বল নাম। আশির দশক থেকে শুরু করে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর কণ্ঠে অসংখ্য গান শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।
কণ্ঠশিল্পী হিসেবে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তিনি সংগীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। দীর্ঘ সংগীতজীবনে তাঁর কণ্ঠের নিজস্ব স্টাইল, মেলোডি এবং আবেগ তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
সংগীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৪ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’ লাভ করেন শুভ্র দেব। ২০২৪ সালের একুশে পদকে সংগীত বিভাগে তাঁর সঙ্গে প্রয়াত এন্ড্রু কিশোরসহ আরও কয়েকজন বিশিষ্ট শিল্পী সম্মানিত হন।
শুভ্র দেবের সংগীতজীবনের শুরু শৈশবেই। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’র গানের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। সেই সাফল্যই তাঁর সংগীতজীবনের পথকে আরও সুদৃঢ় করে।
এরপর আশির দশকে পেশাদার সংগীতাঙ্গনে তাঁর উত্থান। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত প্রথম একক অ্যালবাম ‘হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা’ তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। এই অ্যালবামের শিরোনাম গানটিই পরবর্তীকালে তাঁর সংগীত-পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে।
‘হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা’ থেকে অসংখ্য জনপ্রিয় গান
“আমি হ্যামিলনের সেই বাঁশিওয়ালা…”—এই গানটি একসময় বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মুখে মুখে ফিরত।
এরপর একে একে শ্রোতাদের উপহার দিয়েছেন—
যে বাঁশি ভেঙে গেছে
এ মন আমার পাথর তো নয়
কোন এক সন্ধ্যায়
আমি হ্যামিলনের সেই বাঁশিওয়ালা
সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান।
প্রথম আলোতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শুভ্র দেব নিজেই ‘হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা’ গানটিকে তাঁর সংগীতজীবনের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে তাঁর বহু একক ও যৌথ অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৫ সালের এক প্রতিবেদনে তাঁর ২৬টি একক অ্যালবাম প্রকাশের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এর মধ্যে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা, ককটেল, জুয়েল স্মরণে, যে বাঁশি ভেঙে গেছে, ললিতা, বুকের জমিন এবং জলছবি উল্লেখযোগ্য।
‘এ মন আমার পাথর তো নয়’—এক চিরসবুজ গান
শুভ্র দেবের জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে ‘এ মন আমার পাথর তো নয়’ আজও বিশেষভাবে স্মরণীয়। সময় বদলেছে, সংগীতের ধরন বদলেছে, শ্রোতাদের রুচিতেও এসেছে পরিবর্তন—তবু তাঁর আবেগঘন কণ্ঠের এই গানটি নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে।
এটাই একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় সাফল্য—
সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর গান মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকা।
শুভ্র দেব বাংলাদেশের প্রথম দিককার শিল্পীদের একজন, যিনি MTV-এর মিউজিক ভিডিওতে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন। দেশ-বিদেশে অসংখ্য স্টেজ শো করেছেন। তাঁর সংগীতযাত্রা শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তিনি বাংলা গানকে তুলে ধরেছেন।
এমনকি কিংবদন্তি মাইকেল জ্যাকসনের সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাতের স্মৃতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্টেজ শো করতে গিয়ে মাইকেল জ্যাকসনের সঙ্গে সাক্ষাতের সেই ঘটনা তিনি পরবর্তীকালে স্মৃতিচারণ করেছেন।
শুধু গান নয়, অভিনয় ও বিজ্ঞাপনেও দেখা গেছে শুভ্র দেবকে। জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘শুকতারা’-তে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি দর্শকদের কাছেও আলাদা পরিচিতি পেয়েছিলেন। মডেল হিসেবেও বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন।
শিল্পীর পাশাপাশি মেধাবী শিক্ষার্থী-
শুভ্র দেবের জন্ম ২৬ আগস্ট ১৯৬৬, সিলেটে। শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি সময় কেটেছে সিলেটে। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন (Biochemistry) বিভাগ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
অর্থাৎ, সংগীতের পাশাপাশি পড়াশোনাতেও তিনি ছিলেন সমান মনোযোগী—যা তাঁর জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক।
চার দশকেরও বেশি সময়ের পথচলা
আশির দশকে যাঁর কণ্ঠে শুরু হয়েছিল যাত্রা, সেই শুভ্র দেব আজও সংগীতের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। নতুন গান, অডিও-ভিডিও প্রযোজনা এবং দেশ-বিদেশের মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করে—
সত্যিকারের শিল্পীর বয়স বাড়ে,
কিন্তু তাঁর সৃষ্টির বয়স বাড়ে না।
একসময় তরুণদের হৃদয়ে যে ‘হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা’ বাঁশি বাজিয়েছিলেন, আজও তাঁর সেই সুর কোথাও না কোথাও বেজে ওঠে।
আজ ২৬ আগস্ট, নন্দিত এই শিল্পীর জন্মদিন।
প্রজন্মের পর প্রজন্মকে গান শুনিয়ে যাওয়া, বাংলা আধুনিক গানে নিজস্ব একটি জায়গা তৈরি করা এবং দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দেওয়া শুভ্র দেবের জন্মদিনে রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা, ভালোবাসা ও অভিনন্দন।
শুভ জন্মদিন, শুভ্র দেব।
আপনার কণ্ঠের সুর আরও বহু বছর আমাদের হৃদয়ে বেজে উঠুক—
“এ মন আমার পাথর তো নয়…”।
