জুবিন বড়ঠাকুর, ‘গর্গ’ নামে যিনি কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন।
অসম তথা সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গীত ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতীক, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শিল্পী জুবিন গর্গ শুধু একজন গায়ক ছিলেন না—তিনি ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, সঙ্গীত প্রযোজক, অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, কবি এবং বহু বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী এক অসাধারণ শিল্পী।
মাত্র ৫২ বছর বয়সে সিঙ্গাপুরে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। ২০২৬ সালের মার্চে সিঙ্গাপুরের স্টেট করোনার তদন্তে তাঁর মৃত্যুকে দুর্ঘটনাজনিত ডুবে মৃত্যু হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং তদন্তে কোনও ষড়যন্ত্র বা অন্য কারও দ্বারা জোরপূর্বক পানিতে ফেলে দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
শৈশব ও পরিবার
১৯৭২ সালের ১৮ নভেম্বর মেঘালয়ের তুরায় জন্মগ্রহণ করেন জুবিন গর্গ। তাঁর জন্মনাম ছিল জুবিন বড়ঠাকুর। সাহিত্য ও সঙ্গীতময় পরিবারেই তাঁর বেড়ে ওঠা।
তাঁর বাবা মোহিনী বড়ঠাকুর ছিলেন একজন সরকারি আধিকারিক ও সাহিত্যচর্চায় যুক্ত ব্যক্তি। মা ইলি বড়ঠাকুর ছিলেন গায়িকা ও নৃত্যশিল্পী। মায়ের কাছ থেকেই তাঁর সঙ্গীতজীবনের প্রাথমিক অনুপ্রেরণা আসে। তাঁর ছোট বোন জঙ্কি বড়ঠাকুরও ছিলেন গায়িকা; ২০০২ সালে এক পথ দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। আর এক বোন পাল্মে বড়ঠাকুর ভরতনাট্যমের সঙ্গে যুক্ত।
সঙ্গীতশিক্ষা ও উত্থান
অসমের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর পড়াশোনা শুরু। পরবর্তীতে জোড়হাটের J.B. College এবং গুয়াহাটির B. Barooah College-এ পড়াশোনা করেন। কিন্তু সঙ্গীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ তাঁকে শেষ পর্যন্ত পূর্ণ সময়ের শিল্পীজীবনের দিকে নিয়ে যায়।
তিনি তবলা শিখেছিলেন রবিন ব্যানার্জির কাছে এবং লোকগানের তালিম নিয়েছিলেন রমণী রায়ের কাছে। ১৯৯২ সালের যুব উৎসবে পশ্চিমী ধাঁচের সোলো গানে সোনা জয় তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে ওঠে।
১৯৯২ সালেই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম অসমিয়া অ্যালবাম ‘অনামিকা’। অ্যালবামটি তাঁকে অসমের ঘরে ঘরে পরিচিত করে তোলে এবং শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ সঙ্গীতযাত্রা।
বলিউডে প্রবেশ
১৯৯৫ সালে মুম্বইয়ে পাড়ি দেন জুবিন। এরপর হিন্দি সঙ্গীতজগতে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে। চাঁদনি রাত, ফিজা, কাঁটে সহ বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে তিনি বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করেন।
তবে ২০০৬ সালে অনুরাগ বসুর ‘Gangster’ ছবির ‘Ya Ali’ গানটি তাঁকে সর্বভারতীয় স্তরে এক নতুন পরিচিতি এনে দেয়। গানটির জন্য তিনি Global Indian Film Award (GIFA)-এ Best Playback Singer (Male) পুরস্কার লাভ করেন। পরের বছর Stardust Awards-এ পান New Musical Sensation – Male সম্মান।
জাতীয় পুরস্কার
জুবিন গর্গের শিল্পীজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি আসে ৫৫তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-এ।
‘Echoes of Silence’ ছবির জন্য তিনি Best Music Direction – Non-Feature Film বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ছবিটির ইংরেজি ও খাসি ভাষার নির্মাণে তাঁর সঙ্গীত বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।
বাংলা চলচ্চিত্র ‘Shudhu Tumi’-র জন্যও তিনি BFJA Award for Best Music Director অর্জন করেন।
বাংলা ও অসমিয়া চলচ্চিত্রে অবদান
হিন্দির পাশাপাশি বাংলা ও অসমিয়া চলচ্চিত্রেও জুবিন ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। বাংলা ছবিতে গায়ক ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তাঁর কাজের মধ্যে ‘Shudhu Tumi’, ‘Premi’, ‘Chirodini Tumi Je Amar’-এর মতো ছবি উল্লেখযোগ্য।
অসমিয়া চলচ্চিত্রে তিনি শুধু গান করেননি; অভিনয়, সঙ্গীত পরিচালনা, প্রযোজনা ও পরিচালনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।
‘Mission China’ (২০১৭) এবং ‘Kanchanjangha’ (২০১৯) তাঁর বহুমুখী চলচ্চিত্র-প্রতিভার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। Mission China-র জন্য অভিনয় ও চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও তিনি বিশেষভাবে আলোচিত হন।
বহুভাষিক শিল্পী
জুবিন গর্গের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যগুলির একটি ছিল তাঁর ভাষাগত বৈচিত্র্য। অসমিয়া, বাংলা ও হিন্দির পাশাপাশি তিনি বহু ভারতীয় ভাষা ও উপভাষায় গান গেয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে লোকসঙ্গীত, আধুনিক গান, চলচ্চিত্রের গান, সুফি, রক, পপ—বিভিন্ন ধারার সঙ্গীত এক অনন্য রূপ পেয়েছিল।
তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রকাশিত অ্যালবামগুলির মধ্যে ‘Anamika’, ‘Maya’, ‘Asha’, ‘Rumaal’, ‘Zubeenor Gaan’-সহ অসংখ্য সৃষ্টি তাঁর বহুমুখী সৃজনশীলতার সাক্ষ্য বহন করে।
শিল্পের বাইরেও একজন মানবিক মানুষ
জুবিন গর্গের পরিচয় শুধুমাত্র মঞ্চ ও স্টুডিওতে সীমাবদ্ধ ছিল না। বন্যাদুর্গত মানুষের সাহায্য, সামাজিক উদ্যোগ এবং বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। অসমের ভয়াবহ বন্যার সময়ে ত্রাণ ও সহায়তার জন্য অর্থ সংগ্রহেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন।
অসমের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর সরব উপস্থিতি তাঁকে সাধারণ মানুষের আরও কাছে নিয়ে যায়।
বিতর্কও ছিল তাঁর জীবনের অংশ
জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে জুবিন গর্গকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। তাঁর কিছু প্রকাশ্য মন্তব্য, মঞ্চের আচরণ এবং বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ে অবস্থান নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। অসমের নাগরিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলিতেও তিনি প্রকাশ্যে নিজের মত ব্যক্ত করেছেন।
তবে বিতর্কের ঊর্ধ্বে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তিনি নিজের মাতৃভূমি অসম, অসমিয়া সংস্কৃতি এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একজন শিল্পী।
শেষ অধ্যায়
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে উত্তর-পূর্ব ভারত উৎসবে অংশ নিতে সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন জুবিন। ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি একটি ইয়ট থেকে সাঁতার কাটতে পানিতে নামেন। তদন্ত অনুযায়ী, প্রথমবার লাইফ জ্যাকেট পরে পানিতে নামলেও পরে সেটি খুলে ফেলেন এবং দ্বিতীয়বার পানিতে নামার সময় দেওয়া লাইফ জ্যাকেটও গ্রহণ করেননি। পরে তিনি পানিতে অচেতন হয়ে পড়েন; উদ্ধার করে CPR দেওয়া হলেও তাঁকে বাঁচানো যায়নি। ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ হিসেবে drowning নির্ধারিত হয়।
সিঙ্গাপুরের স্টেট করোনার ২৫ মার্চ ২০২৬-এর রায়ে ঘটনাটিকে accidental drowning বলে উল্লেখ করেন।
জুবিন—একটি আবেগের নাম
ড. ভূপেন হাজারিকার পর অসমের সঙ্গীত ও সংস্কৃতিকে সর্বভারতীয় পরিসরে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া শিল্পীদের মধ্যে জুবিন গর্গের নাম নিঃসন্দেহে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
তিনি ছিলেন অসমের মাটি ও মানুষের কণ্ঠস্বর।
তিনি ছিলেন উত্তর-পূর্ব ভারতের আত্মপরিচয়ের এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রতীক।
তিনি ছিলেন এমন এক শিল্পী, যাঁর গান ভাষার সীমানা অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছেছিল।
তাঁর চলে যাওয়া তাই শুধু একজন গায়কের মৃত্যু নয়—এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের সাংস্কৃতিক জগতের এক অপূরণীয় শূন্যতা।
“আমার কোনো জাতি নাই, কোনো ধর্ম নাই,
আমি মুক্ত, আমিই কাঞ্চনজঙ্ঘা।”
অকালেই থেমে গেল আমাদের যৌবনের এক উন্মাতাল, উদ্দাম, আবেগময় কণ্ঠস্বর।
জুবিন গর্গ আজ শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর গান, তাঁর সুর, তাঁর কণ্ঠ এবং তাঁর সৃষ্টিশীলতার উত্তরাধিকার বেঁচে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। মহান শিল্পী, সুরস্রষ্টা ও মানবিক মানুষ জুবিন গর্গকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা