মালদ্বীপে চলমান বৈদেশিক মুদ্রা ও মার্কিন ডলারের তারল্য সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য দেশে অর্থ প্রেরণ আরও সহজ, নিরাপদ, স্বচ্ছ ও বৈধ করার লক্ষ্যে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজছে বাংলাদেশ হাইকমিশন।
এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার ড. মো. নাজমুল ইসলাম দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে কার্যরত স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, ব্যাংক অব সিলন এবং হাবিব ব্যাংক-এর শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন। বৈঠকগুলোতে মালদ্বীপের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতি, ব্যাংকিং খাতের তারল্য, মুদ্রা রূপান্তর, রেমিট্যান্স প্রেরণ এবং বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য সম্ভাব্য বিকল্প অর্থ প্রেরণ ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈদেশিক মুদ্রা সংকটে রেমিট্যান্স ব্যবস্থায় চাপ
মালদ্বীপের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতির কারণে দেশটিতে কার্যরত ব্যাংকগুলোর জন্য স্থানীয় মুদ্রা রুফিয়া থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর এবং দেশের বাইরে অর্থপ্রবাহ ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাইকমিশনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আলোচনায় উঠে আসে, এ সংকটের প্রভাব শুধু বাংলাদেশি প্রবাসীদের ওপর নয়; মালদ্বীপে কর্মরত ভারতীয়, শ্রীলঙ্কান ও পাকিস্তানি নাগরিকদের রেমিট্যান্স ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে বৈঠকে ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যকার মুদ্রা বিনিময় ও মুদ্রা অদলবদল ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা সম্পর্কেও জানতে চান হাইকমিশনার। এ ধরনের আঞ্চলিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা থেকে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কী ধরনের শিক্ষা নিতে পারে এবং বাংলাদেশের জন্য অনুরূপ কোনো সম্ভাবনা রয়েছে কি না, সে বিষয়েও মতবিনিময় হয়।
শ্রীলঙ্কার ব্যাংকেও রেমিট্যান্সে সীমাবদ্ধতা
ব্যাংক অব সিলনের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বৈঠকে মালদ্বীপে কর্মরত শ্রীলঙ্কান প্রবাসীদের দেশে অর্থ প্রেরণের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা জানায়, মালদ্বীপের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতির কারণে রুফিয়া থেকে শ্রীলঙ্কান রুপিতে রূপান্তরের মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রেমিট্যান্স-সংশ্লিষ্ট নতুন হিসাব খোলার ক্ষেত্রেও বর্তমানে কিছু সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান বলে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।
এতে স্পষ্ট হয় যে, মালদ্বীপের বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের প্রভাব বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের আনুষ্ঠানিক অর্থ প্রেরণ ব্যবস্থার ওপরই পড়ছে।
পাকিস্তানি প্রবাসীদের রেমিট্যান্সেও কমেছে সীমা
পাকিস্তানের হাবিব ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বৈঠকেও একই ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন হাইকমিশনার।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা জানায়, একসময় মালদ্বীপে কর্মরত পাকিস্তানি প্রবাসীদের জন্য প্রায় ১ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত অর্থ প্রেরণের সুবিধা দেওয়া সম্ভব ছিল। পরবর্তীতে তা প্রায় ৫০০ ডলারে এবং বর্তমানে প্রায় ৩০০ ডলারে নেমে এসেছে বলে তারা জানায়। বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা ও মার্কিন ডলারের তারল্য পরিস্থিতিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশি প্রবাসীদের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ ভিন্ন
তিনটি প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে পৃথক বৈঠকের মাধ্যমে হাইকমিশনার মালদ্বীপে বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের অর্থ প্রেরণ ব্যবস্থার বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন।
আলোচনায় উঠে আসে, মালদ্বীপে কর্মরত ভারতীয়, শ্রীলঙ্কান ও পাকিস্তানি প্রবাসীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মী হিসেবে নিয়োজিত। তাদের অনেকে মার্কিন ডলার বা বৈদেশিক মুদ্রায় বেতন-ভাতা পান কিংবা বৈদেশিক মুদ্রায় তুলনামূলক বেশি প্রবেশাধিকার রাখেন।
হাইকমিশনার ড. মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, মালদ্বীপের রুফিয়ায় বেতন পাওয়া একজন বাংলাদেশি কর্মীর জন্য ৫০ বা ১০০ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থও তার পরিবারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অল্প পরিমাণ হলেও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠানোর সুযোগ তৈরি করা প্রবাসীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশের বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, “মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা কঠোর পরিশ্রম করে তাদের উপার্জনের একটি অংশ দেশে পরিবারের কাছে পাঠান। তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো বোঝা এবং অর্থ প্রেরণকে আরও সহজ, নিরাপদ ও বৈধ করার জন্য সম্ভাব্য প্রতিটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই পথ অনুসন্ধান করা আমাদের দায়িত্ব।”
হাইকমিশনার আরও বলেন, “মালদ্বীপের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা সংকট একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং খাতের চ্যালেঞ্জ, যা শুধু বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
হাইকমিশনার স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, ব্যাংক অব সিলন এবং হাবিব ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনাকে তাদের অভিজ্ঞতা, সহযোগিতা ও বাস্তবভিত্তিক মতামত তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য কার্যকর রেমিট্যান্স ব্যবস্থা অনুসন্ধানে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মালদ্বীপের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ধারাবাহিক যোগাযোগ ও সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ হাইকমিশন জানিয়েছে, মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য আরও সহজ, নিরাপদ, স্বচ্ছ ও আইনসম্মত রেমিট্যান্স ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
মোঃ আল আমিন
মালদ্বীপ প্রতিনিধি
