হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু পরিচালক আছেন, যাঁরা শুধু সিনেমা বানাননি—নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক, আবেগ, সমাজের অন্ধকার দিক এবং মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বকে পর্দায় তুলে এনে দর্শককে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন। মহেশ ভাট তাঁদেরই একজন।
ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক মহেশ ভাট মূলত হিন্দি সিনেমায় তাঁর সাহসী বিষয় নির্বাচন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতানির্ভর গল্প এবং বাস্তবধর্মী নির্মাণের জন্য পরিচিত। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে তিনি হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত ও প্রভাবশালী নির্মাতা হয়ে ওঠেন।
মহেশ ভাটের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বোম্বে প্রেসিডেন্সির বোম্বে শহরে (বর্তমান মুম্বাই)। তাঁর বাবা নানাভাই ভাট ছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক-প্রযোজক এবং মা শিরিন মোহাম্মদ আলি। তাঁর ছোট ভাই মুকেশ ভাট পরবর্তীকালে চলচ্চিত্র প্রযোজনার জগতে প্রতিষ্ঠিত হন।
মহেশ ভাট মাতুঙ্গার ডন বস্কো হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি বিভিন্ন কাজ ও বিজ্ঞাপনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরবর্তীকালে পরিচালক রাজ খোসলা-র সহকারী হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন।
পরিচালক হিসেবে পথচলা -
১৯৭০-এর দশকে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর ধীরে ধীরে নিজের স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি করেন মহেশ ভাট। তাঁর চলচ্চিত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, দাম্পত্যের টানাপোড়েন, প্রেম, বিচ্ছেদ, মানসিক সংকট, সামাজিক বাস্তবতা এবং মানুষের দুর্বলতা বারবার ফিরে এসেছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—
অর্থ (১৯৮২) — দাম্পত্য সম্পর্ক ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে নির্মিত এই ছবি তাঁর অন্যতম আলোচিত কাজ। ছবিটির সংলাপের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান।
সারাংশ (১৯৮৪) — এক বৃদ্ধ দম্পতির শোক, অস্তিত্বের সংকট ও জীবনের অর্থ খোঁজার গল্প। ছবিটি ১৪তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং ১৯৮৪ সালে অস্কারের Best Foreign Language Film বিভাগে ভারতের সরকারি মনোনয়ন হিসেবে পাঠানো হয়েছিল।
নাম (১৯৮৬) — এই ছবির মাধ্যমে তিনি আরও বেশি বাণিজ্যিক ধারার দর্শকের কাছে পৌঁছান। ড্যাডি (১৯৮৯) — বাবা-মেয়ের সম্পর্ক ও এক মদাসক্ত মানুষের জীবনের টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে নির্মিত আবেগঘন ছবি।
আশিকি (১৯৯০) — প্রেম, গান ও আবেগের এক জনপ্রিয় মিশ্রণ। ছবিটি হিন্দি সিনেমার রোমান্টিক মিউজিক্যাল ধারায় বিশেষ জায়গা করে নেয়।
দিল হ্যায় কে মানতা নেহি (১৯৯১) — আমির খান ও পূজা ভাট অভিনীত এই রোমান্টিক ছবি বক্স অফিসেও সাফল্য পায়।
সড়ক (১৯৯১) — সঞ্জয় দত্ত ও পূজা ভাট অভিনীত এই ছবি মহেশ ভাটের অন্যতম জনপ্রিয় কাজ।
জখম (১৯৯৮/১৯৯৯) — ব্যক্তিগত ও সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবির জন্য তিনি ফিল্মফেয়ারে সেরা কাহিনির পুরস্কার পান।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি--
দীর্ঘ কর্মজীবনে মহেশ ভাট একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কারসহ একাধিক সম্মান। সারাংশ তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষ ফিল্মস ও প্রযোজক হিসেবে ভূমিকা
ভাই মুকেশ ভাটের সঙ্গে তিনি বিশেষ ফিল্মস (Vishesh Films)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রযোজনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই ব্যানারের অধীনে রাজ, জিসম, মার্ডার, গ্যাংস্টার, জন্নত, আশিকি ২সহ একাধিক জনপ্রিয় ছবি নির্মিত ও প্রযোজিত হয়েছে। ২০২১ সালে মহেশ ভাট বিশেষ ফিল্মস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আলাদা হয়ে যান।
নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ
পরিচালনার পাশাপাশি মহেশ ভাট বহু অভিনেতা, লেখক ও তরুণ শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছেন এবং তাঁদের পেশাগত যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। অনুপম খেরসহ একাধিক শিল্পীর ক্যারিয়ারে তাঁর প্রভাবের কথা বিভিন্ন জীবনী ও সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে।
পরিচালকের আসনে শেষ অধ্যায়
১৯৯৯ সালের পর তিনি দীর্ঘ সময় পরিচালনা থেকে দূরে ছিলেন। প্রায় দুই দশক পর ‘সড়ক ২’ (২০২০) দিয়ে আবার পরিচালনায় ফেরেন। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তিনি স্পষ্ট করে জানান যে আর কোনো ফিচার ফিল্ম পরিচালনা করার পরিকল্পনা তাঁর নেই। অর্থাৎ সড়ক ২-কেই তাঁর শেষ পরিচালিত ফিচার ছবি হিসেবে ধরা হচ্ছে। ভবিষ্যতে তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান।
বর্তমান চলচ্চিত্রের পরিবেশ সম্পর্কে মহেশ ভাট সমালোচনা করেছেন—বিশেষ করে বাজার ও ডেটা-নির্ভর সিদ্ধান্তের ফলে কনটেন্ট আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিল্পীর সৃজনশীল স্বাধীনতা ও গল্প বলার সাহস গুরুত্বপূর্ণ।
সাড়ে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় সিনেমার সঙ্গে যুক্ত মহেশ ভাটের যাত্রা নিছক একজন পরিচালকের যাত্রা নয়। তাঁর চলচ্চিত্রে যেমন ছিল প্রেম ও সম্পর্কের গল্প, তেমনই ছিল ব্যক্তিগত যন্ত্রণা, সামাজিক বাস্তবতা, ধর্মীয় পরিচয়, মানসিক দ্বন্দ্ব এবং মানুষের জীবনের নানা অন্ধকার অধ্যায়।
আজ তাঁর ৭৮তম জন্মদিনে রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা। তাঁর সুস্থতা, দীর্ঘায়ু ও সৃজনশীল জীবনের জন্য রইল শুভকামনা।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা