অর্চনা পুরন সিং ভারতীয় বিনোদন জগতের এক অত্যন্ত পরিচিত ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শিল্পী। অভিনেত্রী, মডেল, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, উপস্থাপক এবং কমেডি শো-এর বিচারক—বিভিন্ন ভূমিকায় দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দর্শকদের বিনোদন দিয়ে চলেছেন। বিশেষ করে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত হাসি, প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব এবং কৌতুক চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি আলাদা পরিচিতি অর্জন করেছেন। অর্চনা পুরন সিং
জন্ম: ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৬২
দেরাদুন, উত্তরপ্রদেশ, ভারত
(বর্তমানে দেরাদুন, উত্তরাখণ্ড)
শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দেরাদুনে। সেখানেই জেসাস অ্যান্ড মেরি কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে দিল্লির মর্যাদাপূর্ণ লেডি শ্রী রাম কলেজ ফর উইমেন থেকে ইংরেজিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাই পাড়ি দেন এবং মডেলিং ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিনোদন জগতে নিজের পথ তৈরি করতে শুরু করেন।
মডেলিং থেকে অভিনয়ের পথে
মুম্বাইয়ে শুরুতে বিজ্ঞাপনে কাজ করেন অর্চনা। বিশেষ করে একটি জনপ্রিয় ব্যান্ড-এইড বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তিনি নজরে আসেন। এরপর অভিনেতা ও পরিচালক জালাল আগা তাঁকে তাঁর টেলিভিশন সিরিয়াল মিস্টার অ্যান্ড মিসেস-এ সুযোগ দেন। পরবর্তীতে করমচাঁদ-এর মতো জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিকেও কাজ করেন।
চলচ্চিত্রে অভিষেক — ১৯৮৭
১৯৮৭ সালে জলওয়া চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে। ছবিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন নাসিরুদ্দিন শাহ। এরপর অগ্নিপথ (১৯৯০), সওদাগর (১৯৯১), শোলা অউর শবনম (১৯৯২), আশিক আওয়ারা (১৯৯৩) এবং রাজা হিন্দুস্তানি (১৯৯৬)-সহ একাধিক চলচ্চিত্রে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেন।
তবে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে এসে তাঁর অভিনয়জীবনে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ ও মিস ব্রাগাঞ্জা
১৯৯৮ সালে করণ জোহরের প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’-এ মিস ব্রাগাঞ্জা চরিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত করে তোলে।
ছোট কিন্তু অত্যন্ত স্মরণীয় এই কৌতুক চরিত্রটি আজও হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় পার্শ্বচরিত্র হিসেবে দর্শকদের মনে রয়েছে।
আরও কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র
অর্চনা পুরন সিংয়ের অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের তালিকায় রয়েছে—
- রাজা হিন্দুস্তানি — ১৯৯৬
- কুছ কুছ হোতা হ্যায় — ১৯৯৮
- মোহাব্বতেঁ — ২০০০
- মেলা — ২০০০
- ঝংকার বিটস — ২০০৩
- কৃষ — ২০০৬
- ওয়ে লাকি! লাকি ওয়ে! — ২০০৮
- মেরে বাপ পেহলে আপ — ২০০৮
- বোল বচ্চন — ২০১২
- কিক — ২০১৪
- ডলি কি ডোলি — ২০১৫
- ভার্জিন ভানুপ্রিয়া — ২০২০
এছাড়াও বিভিন্ন চলচ্চিত্রে বিশেষ উপস্থিতি ও কৌতুকধর্মী চরিত্রে তাঁকে দেখা গেছে।
টেলিভিশনে অনন্য জনপ্রিয়তা
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টেলিভিশনেও অর্চনা পুরন সিংয়ের দীর্ঘ ও সফল ক্যারিয়ার রয়েছে। বিশেষ করে ‘কমেডি সার্কাস’-এর বিচারক হিসেবে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ২০০৬ সাল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং কমেডি প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে তাঁর হাস্যরসাত্মক মন্তব্য ও প্রাণখোলা হাসি দর্শকদের কাছে অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে।
এরপর ‘দ্য কপিল শর্মা শো’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। অনুষ্ঠানে তাঁর হাসি ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া নিজেই যেন অনুষ্ঠানের একটি পরিচিত অংশ হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কপিল শো’-তেও তাঁকে দেখা যায়।
অভিনেত্রী হিসেবে নতুন করে কাজের আগ্রহ
টেলিভিশনের বিপুল জনপ্রিয়তার পাশাপাশি অর্চনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও অভিনয়ের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার কথা বলেছেন।
২০২৬ সালের বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, দ্য কপিল শর্মা শো-এর ব্যস্ত সময়সূচির কারণে অতীতে অনেক চলচ্চিত্রের প্রস্তাব গ্রহণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে কমেডি শো-এর সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে তাঁকে মূলত হাস্যরসাত্মক চরিত্রের সঙ্গে বেশি করে ভাবা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে তিনি আবারও অভিনয়ের নতুন সুযোগ খুঁজছেন এবং কমেডির বাইরেও বৈচিত্র্যময় চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
ব্যক্তিজীবন
অর্চনা পুরন সিং ১৯৯২ সালে অভিনেতা পরমীত শেঠিকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই পুত্র—আর্যমান শেঠি ও আয়ুষ্মান শেঠি। দীর্ঘদিনের দাম্পত্য জীবনে দুজনকেই বিভিন্ন সময়ে একসঙ্গে কাজ করতে ও পর্দায় দেখা গেছে।
অভিনয় ও টেলিভিশনের পাশাপাশি বর্তমানে অর্চনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবেও সক্রিয়। তাঁর নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে ব্যক্তিজীবন, পরিবার ও দৈনন্দিন জীবনের নানা মুহূর্ত দর্শকদের সঙ্গে ভাগ করে নেন।
একজন শিল্পীর দীর্ঘ যাত্রা
মডেলিং দিয়ে শুরু, বিজ্ঞাপন ও টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্র—আর পরবর্তীতে কমেডি শো-এর অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠা—অর্চনা পুরন সিংয়ের ক্যারিয়ার নিঃসন্দেহে বৈচিত্র্যময়।
কখনও কুছ কুছ হোতা হ্যায়-এর মিস ব্রাগাঞ্জা, কখনও রাজা হিন্দুস্তানি বা মোহাব্বতেঁ-এর পার্শ্বচরিত্র, আবার কখনও কমেডি সার্কাস কিংবা কপিল শর্মা-র অনুষ্ঠানের হাস্যোজ্জ্বল বিচারক—প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র উপস্থিতি তৈরি করেছেন।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় বিনোদন জগতে সক্রিয় থেকে অর্চনা পুরন সিং আজও দর্শকদের কাছে সমানভাবে পরিচিত ও প্রিয়। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—একটি প্রাণখোলা হাসি, যা পর্দার ওপার থেকেও দর্শকের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারে।
জন্মদিনে প্রিয় শিল্পী অর্চনা পুরন সিংকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা, অফুরন্ত ভালোবাসা ও অভিনন্দন। তাঁর আগামী দিনগুলো হোক সুস্বাস্থ্য, আনন্দ, পারিবারিক সুখ এবং আরও অনেক সুন্দর কাজের সাফল্যে পরিপূর্ণ—এই শুভকামনা রইল।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা