নোয়াখালীর উপকূলীয় দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার সর্বত্র এখন সোনালি ধানের উৎসব। চরাঞ্চল থেকে মূলভূমি পর্যন্ত প্রতিটি মাঠেই পাকা ধানের শীষ বাতাসে দুলে উঠছে। কোথাও কৃষকেরা ব্যস্ত ধান কাটায়, কোথাও বা মাড়াই–শুকানো অথবা বাজারে বিক্রির তোড়জোড়। বর্ষা ও মৌসুমী আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার আমনে হাতিয়া জুড়ে বাম্পার ফলন হয়েছে ফলে খুশির হাসি ফুটেছে কৃষকের মুখে।
নিঝুমদ্বীপের ছেউয়াখালী গ্রামের কৃষক আব্দুল হক খবরের কাগজকে বলেন, লবণাক্ত পানির ভয় থাকায় দেশি জাতের আমন চাষ করেছিলেন। দ্বীপের পরিস্থিতি বিবেচনায় এই জাতটি লবণাক্ততা সহনশীল হওয়ায় ক্ষতির আশঙ্কা কম। দুই একর জমি থেকে প্রায় ৮০ মন ধান পেয়েছেন তিনি যা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। তবে জমির পাশে চলাচলের উপযোগী রাস্তা না থাকায় মাথায় বোঝা করে ধান বাড়িতে নিতে হবে—এটাই তার একমাত্র কষ্ট।
একই এলাকার মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের পাশে ধান মাপতে দেখা গেল কৃষক নুরুল ইসলামকে স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের সবাইকে নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। নুরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, বনবিভাগের বাগানের পাশের দুই একর জমিতে আমন চাষে তাঁর খরচ হয়েছিল ২০ হাজার টাকার মতো। জোয়ারে পানি কম উঠেছে, বৃষ্টিও ঠিক সময়ে হয়েছে সব মিলিয়ে ফলন খুব ভালো। এবার ধান বিক্রি করে ভালো লাভ করতে পারব বললেন তিনি।
ঢালচর, চরগাসিয়া, চর আতাউর, নীমতলী, দমারচরসহ চারপাশের চরের চিত্রও একই। এসব অঞ্চলের কৃষকেরা মূলত দেশি জাতের আমন চাষ করেন, যা মৌসুমের শুরুতেই রোপণ হওয়ায় দ্রুত পেকে যায়। ফলে তারা অন্যদের চেয়ে আগে ধান কাটতে পারছেন। অন্যদিকে মূল হাতিয়া, অর্থাৎ বেড়িবাঁধের ভেতরের জমিতে চাষ হয়েছে উফসী জাতের আমন। এখনও শীষ পুরোপুরি পাকেনি, তবে মাঠের অবস্থা দেখে কৃষকেরা আশাবাদী এই ধারাবাহিকতা রেকর্ড ফলন এনে দেবে।
সোনাদিয়া ইউনিয়নের পূর্ব চরচেঙ্গা গ্রামের কৃষক আব্দুল হক খবরের কাগজকে বলেন, গত কয়েক বছর অতিবৃষ্টির কারণে চাষাবাদে তেমন সুবিধা করতে পারেননি তিনি । কিন্তু এবার আবহাওয়া ছিল একেবারে অনুকূলে। এক একর জমিতে ইরি ধান করেছি। আশা করছি ৬০–৭০ মন ধান পাব। এমন ফলন বহু বছর ধরেই পাইনি।
সোনাদিয়া পশ্চিম মাইচরা গ্রামের কৃষক সোহেল রানা খবরের কাগজকে বলেন , আমরা যারা চরাঞ্চলে থাকি, প্রকৃতির ওপর ভরসা করে চাষ করি। এই বছর তেমন কোনো রোগবালাই হয়নি। খরচের তুলনায় ধান অনেক ভালো পেয়েছি।
অন্যদিকে হাতিয়ার চরকিং ইউনিয়নের কৃষক সৌরাভ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন বলেন, আগে চাকরি খুঁজতে শহরে যেতে চাইতাম। কিন্তু এখন দেখছি সঠিক সময়ে চাষ করলে কৃষিতেই ভালো আয় করা যায়। এবার চার বিঘায় চাষ করে যা পেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ , তাতে পরের মৌসুমে জমি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
হাতিয়া উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, এ বছর মোট ৭৭ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। এর মধ্যে দেশি জাতের আমন ১০ হাজার ৫১০ হেক্টর এবং উফসী জাত ৬৭ হাজার ২৪০ হেক্টর জমিতে। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ১৬ হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন উৎপাদনের—যা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল বাছেদ সবুজ খবরের কাগজকে বলেন, আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এবং মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরামর্শে এ বছর আমনে বাম্পার ফলন হয়েছে। হাতিয়ার প্রতিটি ইউনিয়নেই উৎপাদন গত কয়েক বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। সোনালি ধানে ভরে উঠেছে পুরো হাতিয়া আর সেই ধানের হাসিতে খুশিতে ভরে উঠেছে কৃষকের ঘরও।
