মাথার ওপর পলিথিন আর তেরপালের ছাদ, কিন্তু পায়ের নিচে নিজের মাটি নেই। কাঁপা হাতে লাঠি ধরে গালে হাত দিয়ে বসে থাকা শতবর্ষী নুর ইসলামের জীবনের গল্প এক শতাব্দীর নয়, বরং নদী ভাঙনের বেদনাবিধুর মহাকাব্যের মতো। একশ বছর বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর, কাঁপা হাত, কিন্তু স্মৃতিগুলো এখনও পাথরের মতো শক্ত—প্রতিটি স্মৃতিতে ধ্বংসের গর্জন, নদীর হাহাকার আর ঘর হারানোর আর্তনাদ।
এই গল্প নোয়াখালী জেলার বিছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার নলচিরা ইউনিয়নের ৮ নাম্বার ওয়ার্ডের বাসিন্দা শতবর্ষী নুর ইসলামের—যিনি জীবনের তিন অধ্যায়ে তিনবার সবকিছু নদীতে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখেছেন।
বয়স প্রায় ১০০ বছর চোখে ঝাপসা, হাঁটতে কষ্ট হয়, তবু বুকের গভীরে খোদাই হয়ে আছে মেঘনার ভয়াল রূপ। তার কাছে নদী শুধু জলধারা নয়—এটি যেন নিয়তির নিষ্ঠুর হাত, যা বারবার ছিনিয়ে নেয় মানুষের বাঁচার ঠিকানা, স্মৃতি ও অস্তিত্ব।
মেঘনার ভাঙনে ইতোমধ্যে একে একে বিলীন হয়ে গেছে—দাদার ভিটা, বাবার শেষ সম্বল, এমনকি নিজের হাতে গড়া সংসারও। তিন প্রজন্মের অস্তিত্ব গায়েব করা সেই নদী এখনও থামেনি। ভিটা হারিয়ে আজ নুর ইসলামের আশ্রয় অন্যের জায়গায় বেড়ির এক কোণে। মাথার ওপর তেরপালের ছাদ আছে, কিন্তু পায়ের নিচে নিজের মাটি নেই। ঠিকানাহীন এই বৃদ্ধের জীবনে সবচেয়ে বড় দুঃখ—বাঁচার মতো একটি নিজস্ব জমি নেই।
স্মৃতির ভারে কাঁপা গলায় তিনি বলেন “দাদার ভিটা নদীতে গেছে বাবার চোখের সামনে… বাবার ভিটা গেছে আমার চোখের সামনে… আর আমার সব শেষ হইছে ছেলেমেয়ের চোখের সামনে…”এই কথা বলার পর দীর্ঘশ্বাস চেপে ধরেন, যেন নিঃশ্বাসের সঙ্গে বুকের ভাঙনও বেরিয়ে আসে।
জীবনের শত বছর বয়সে সুখের চেয়ে সংগ্রামের পাল্লাই ভারী তার জীবনে। কিশোর বয়সে প্রথম নদীর ভাঙন দেখেছেন, যৌবনে দ্বিতীয়বার বসতভিটা হারিয়েছেন, আর বৃদ্ধ বয়সে এসে শেষ সম্বলটুকুও মেঘনার পেটে সমর্পণ করতে হয়েছে।
ঘরের উঠান, শৈশবের খেলার মাটি, হাত লাগানো ফলের গাছ, সংসারের স্মৃতিঘেরা প্রতিটি ইট-পাথর—সবকিছু নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। নিজের ভূমিতে দাঁড়িয়ে আর কখনও সূর্য ওঠা দেখবেন কি না, সেটাও জানেন না এই বৃদ্ধ।
ভাঙন কবলিত নুর ইসলাম আজ বসবাস করছেন অন্যের জায়গায় বেড়ির কুলে একপাশে—যেখানে পা ফেলতেও যেন অনুমতি লাগে। মাটিহীন মানুষের নীরব অপমান, অনিশ্চয়তার বোঝা আর নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক প্রতিদিন তাকে গ্রাস করে।
তিনি কাঁপা কণ্ঠে আরও বলেন “মরণে ভয় পাই না বাবা… ভয় পাই, আরেকবার যদি ভাঙে, মরার আগে যামু কই।” এই প্রশ্ন শুধু একজন নুর ইসলামের নয়, এটি মেঘনা-পাড়ের হাজারো ভাঙনপীড়িত মানুষের বুকচেরা আর্তি।
হাতিয়া অঞ্চলে নদী ভাঙন যেন নিয়তির অংশে পরিণত হয়েছে। এখানে মানুষ নদীর সাথে যুদ্ধ করেই জন্মায়, যুদ্ধেই বড় হয়, আর যুদ্ধের ক্ষত নিয়েই শেষ নিঃশ্বাস ফেলে। কেউ বাঁচে, কেউ হারিয়ে যায়, কিন্তু নদী থামে না—থামে না মানুষের হারানোর গল্পও।
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি স্থায়ী নদী তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ, ভূমিহীনদের পুনর্বাসন প্রকল্প, সরকারি সহায়তায় নিরাপদ বসতভূমি ব্যবস্থা এবং ভাঙনে সর্বহারা পরিবারগুলোর জরুরি সহায়তা।
তাদের বক্তব্য একটাই বাঁধ না হলে ঘর হারাবে মানুষ, পরিচয় হারাবে ইতিহাস।
নুর ইসলামের জীবনের শেষ চাওয়া খুব সাধারণ, কিন্তু তার জন্য—খুব ব্যয়বহুল। তিনি বলেন—মরার আগে কইতে পারলে—এই মাটিটা আমার… তাইলেই জীবনডা স্বার্থক হইতো।”তার চোখের ভাষা বলে দেয়—বাঁচতে না পারলেও, অন্তত নিজ জন্মভূমির মাটিতে দেহটা গচ্ছিত রাখতে চান তিনি।
মেঘনা প্রতিদিন ভাঙে, মানুষও প্রতিদিন ভাঙে… কিন্তু নদী থামে না, থামে না মানুষের দীর্ঘশ্বাস, শুধু হারিয়ে যায় আরও কিছু ঠিকানা, আরও কিছু ইতিহাস
নুর ইসলামের স্ত্রী রাশেদা বেগম চোখ মুছতে মুছতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন—
“শ্বশুরের বিশাল বাড়ি আজ শুধুই স্মৃতি। শ্বশুরের দেওয়া ভিটা, স্বামীর গড়া সংসার—সব মেঘনার গর্ভে হারিয়ে গেছে। আমরা আজ সর্বহারা। নদীর সাথে লড়াই করতেই যেন জীবনটা কেটে গেল।”
তিনি থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। বুকভাঙা আর্তনাদে বলেন—“এক মেয়েকে বহু কষ্টে বিয়ে দিয়েছি। এখন শুধু একটি ছেলেই সম্বল, অথচ তার মাথা গোঁজারও জায়গা নেই। ঘরবাড়ি সব হারিয়ে আজ আমরা খোলা আকাশের নিচে, বেড়িবাঁধের কোলে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে আছি।”
মেঘনার স্রোতের গর্জন যেন এখনও তার কানে বাজে “নদীর পানি যখন বাড়ে, বুকের ভিতরটা ধড়ফড় করে ওঠে। মনে হয়—নদী শুধু আমাদের জমি নেয়নি, আমাদের স্বপ্ন, আমাদের ভবিষ্যৎ—সব গিলে খেয়েছে। রেখে গেছে শুধু কান্না আর অসহায়ত্ব।
স্বপ্নহীন জীবনের বোঝা বয়ে নেওয়া রাশেদা আরও বলেন “আমার স্বামী আজ ঘরহীন, অসুস্থ শরীর নিয়ে দিন কাটাচ্ছে, মৃত্যুর প্রহর গুনছে। আমাদের ছেলের সামান্য যা আয়, তা দিয়েই ওষুধ কিনি—তবু জানি না, কতোদিন আর টিকে থাকব। আল্লাহ কবে ডাক দেন, জানি না… কিন্তু যাওয়ার আগে শুধু একটাই চাওয়া—আমার ছেলেটার জন্য যদি একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে পারতাম।”
চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন “কাঁদতে কাঁদতে এখন আর চোখেও পানি আসে না… তবু বুকটা প্রতিদিন কাঁদে।
বেড়ির কূলে পাশের ঘরের অরনী বালা দাস বলেন “আমাদের অবস্থা এমন যে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। দিন আনি দিন খাই, সংসারে একদিন কাজ না থাকলেই চুলা জ্বলে না। নদীভাঙনে ঘর হারাই, জমি হারাই, পথে বসে যাই—কিন্তু সাহায্য পাই না। সরকার যদি স্থায়ী বাঁধ, পুনর্বাসন আর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে, তাহলে আমাদের মতো পরিবারগুলো একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আমরা আর ত্রাণ নয়, বাঁচার মতো ব্যবস্থা চাই।”
নলচিরা ইউনিয়নের পল্লী চিকিৎস আবদুর রহমান বলেন
“প্রতিদিন দেখি নদী লোকের ঘর খাইয়া ফেলে, কিন্তু আমাদের কান্নার আওয়াজ সরকারে কানে পৌঁছায় না। আমরা ভোট দিই, স্লোগান দিই, রোদ-বৃষ্টিতে রাজপথে থাকি—কিন্তু বিপদের সময় নদীভাঙা মানুষগুলোর পাশে কেউ দাঁড়ায় না। আমরা চাই, দলমত নির্বিশেষে সরকার ও জনপ্রতিনিধিরা এই এলাকার জন্য স্থায়ী বাঁধ, পুনর্বাসন আর ভূমিহীনদের ঘরের ব্যবস্থা করুক। অনুদান নয়, ভিক্ষা নয়—বাঁচার অধিকার চাই। মেঘনা যেভাবে গ্রাম গিলে খাচ্ছে, এভাবে চললে মানুষ নয়, হাতিয়ার মানচিত্রটাই শেষ হয়ে যাবে।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জামিল আহমেদ পাটোয়ারী জানান, নদীভাঙন রোধে হাতিয়ার বিভিন্ন স্থানে জিও ব্যাগ দিয়ে বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। এছাড়া ঘাট এলাকায় জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ব্যবহার করে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের পরে এসব কাজ শুরু করা হয়েছে এবং যতটা সম্ভব নদীভাঙন রোধে কাজ অব্যাহত আছে।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বলেন, হাতিয়ার নদীভাঙন একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং প্রবল জোয়ার-ভাটার কারণে বারবার ভাঙন ঘটছে। স্থায়ী নদী নিয়ন্ত্রণ এবং তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত এই দুর্ভোগ চলবে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে।
স্থানীয়রা উল্লেখ করেছেন, হাতিয়ার নদীভাঙন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি মানবিক বিপর্যয়ের আকার নিয়েছে। মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং তারা যেন রাষ্ট্রের দৃষ্টি থেকে দূরে রয়েছে। তাই এবার নদীভাঙন রোধে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করা হচ্ছে।
