নোয়াখালী জেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার চরকিং ইউনিয়নের প্রান্তিক জনপদের অবস্থিত আজমার খাল। শত শত বছরের ইতিহাস, জনবসতি, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নানাবিধ সামাজিক-অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে খালটির গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে খালের উপর আজও একটি স্থায়ী সেতু না থাকায় দুই পাশের হাজারো মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
আজমার খালের ইতিহাসে জানা যায়, এক সময় এটি ছিল কৃষি ও নৌ-বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম। কৃষকরা জমি সেচ দিতে খালের পানি ব্যবহার করার পাাশাপাশি খালের মাছ ধরে আমিষের অভাব দূর করতেন। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানি রপ্তানিতে খালের উপর নির্ভরশীল ছিলেন।
সময়ের পরিবর্তন হলেও খালের গুরুত্ব আজও কমেনি, বরং বেড়েছে বহুগুণ। চরকিং ও তমরদ্দি ইউনিয়নের প্রায় ২০ হাজার মানুষ প্রতিদিন শিক্ষা, চিকিৎসা, হাট-বাজার, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য এ খালের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ১৫০ ফুট খালের উপর কয়েকটি অস্থায়ী বাঁশের সাঁকোতে যুগের পর যুগ চলছে পারাপারের একমাত্র ভরসা।
বর্ষা মৌসুমে খাল ফুলে-ফেঁপে উঠলে সাঁকুগুলো প্রায় অচল হয়ে যায়। তখন ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে খাল পার হতে হয়। স্কুলগামী শিশু, কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন। নারী, শিশু এবং বৃদ্ধরা এই পারাপারে সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকেন। প্রায়ই খালে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
কৃষকরাও বিপাকে পড়েন। ধান, সবজি কিংবা বাজারজাত পণ্য নিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে তারা চরমভোগান্তিতে পড়েন। ফলে উৎপাদিত ফসল ন্যায্যমূল্যে বিক্রি না করতে পারায় স্থানীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে।
স্থানীয়দের মতে, একটি স্থায়ী সেতু নির্মিত হলে চরকিং ইউনিয়নের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক উন্নয়নে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য পরিবহনে সুবিধা হবে, ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুলের পথে ঝুঁকি কমবে, স্থানীয়দের কাছে জরুরি চিকিৎসা সেবা পাওয়া সহজ হবে।
স্থানীয় প্রবীণরা জানান, কয়েক যুগ ধরে এই খালের উপর একটি স্থায়ী সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। নির্বাচন এলেই জন প্রতিনিধিরা প্রতিশ্রুতি দেন। মানববন্ধনও হয়েছে বহুবার। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি এখনো।
চরকিং ইউনিয়নের বাসিন্দা শেখ ফরিদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে বুক কাঁপে। সাঁকো থেকে পড়ে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ফলে বিরুপ পরিস্থিতির কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে হাজার হাজার শিশু।
সাঁকোর পাশের দোকানদার মো. সিরাজ বলেন, “আমি ২৭ বছর ধরে এখানে দোকানদারি করছি। কত ঘটনা যে দেখেছি। কিছুদিন আগেও তমরদ্দি মাদ্রাসার দুই ছাত্রী খালে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছে। ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত প্রায়ই কেউ না কেউ দুর্ঘটনায় পড়ছেন।
চরকিং ইউনিয়ন পরিষদের ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. শাহাজান বলেন, “আজমার খালের ওপর একটি সেতু নির্মাণ স্থানীয়দের প্রাণের দাবি। আমরা বারবার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছি।
চরকিং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাঈম উদ্দিন আহমেদ বলেন, “খালের উপর একটি টেকসই সেতু নির্মাণ হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিরাট অগ্রগতি হবে। এ বিষয়টি ইতোমধ্যে আমরা সরকারের কাছে জানিয়েছি, আশা করি দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া খুবই প্রয়োজন।আজমার খালের দুই পাড়ের মানুষের কাছে একটি সেতুর অভাব প্রকট জীবন-জীবিকার প্রতীকী দুঃখ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তারা সরকারের কাছে টেকসই একটি সেতু নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডেরে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী।জামিল আহম্মদ বলেন ,বাপাউবো কর্তৃক প্রস্তাবিত সমন্বিত হাতিয়ার ডিপিপিতে আজমার দোনা খালের মুখে একটি স্লুইসগেট এর নির্মাণ কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যা ইতোমধ্যে বোর্ডে দাখিল করা হয়েছে।