মানিকগঞ্জের সিংগাইরে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা চালিয়ে আসার অভিযোগ উঠেছে আইকন ফোর্স সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেড নামের একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। প্রতারিত হওয়া লোকজনের চাপ বাড়লেই বদলে ফেলেন অফিসের ঠিকানা- কখনো মানিকগঞ্জ কিংবা গাজীপুর। এরই ধারাবাহিকতায় নতুন করে সিংগাইরে অফিস খুলে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই শতাধিক বেকার মানুষের কাছ থেকে প্রায় অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ইকবাল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী মায়া খন্দকারের বিরুদ্ধে। খবর গণমাধ্যমের।
সাভারের হেমায়েতপুরের সিফাত হোসেন ও সৌরভ হোসেন নামে দুই নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী পড়াশুনার পাশাপাশি খন্ডকালীন চাকরি খুঁজছিলেন। একদিন স্কুলের সামনে বৈদ্যুতিক খুঁটিতে সাঁটানো প্রতিষ্ঠানটির লিফলেট দেখে আকৃষ্ট হন তারা। তাতে ব্যাংক, হাসপাতাল থেকে শুরু করে রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ‘আকর্ষণীয় বেতনে’ কর্মী নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত ফোন নম্বরে কল করে জানতে চাইলে তাদের সিংগাইরের বাস্তা বাসস্ট্যান্ডের একটি ভবনে গিয়ে যোগাযোগ করতে বলা হয়। সেখানে গিয়ে পরিচালক ইকবালের পরামর্শে কথা বলেন মায়া খন্দকারের সঙ্গে। ‘খণ্ডকালীন কাজ আছে’- এমন আশ্বাসে তারা চাকরি করতে রাজি হন। যোগদানের আগে তাদের কাছ থেকে আইডি কার্ড, ড্রেস ও পুলিশ ভেরিফিকেশন বাবদ নেওয়া হয় ৬,৫০০ টাকা।
পিয়ন পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে তাঁদের দিয়ে লিফলেট বিতরণ ও পোস্টার লাগানোর কাজ করানো হতো। মাস শেষে বেতন চাইলে ইকবাল ও মায়া নানা অজুহাত দেখিয়ে তাদের এড়িয়ে যেতেন। দেড় মাস কাজ করেও কোনো পারিশ্রমিক না পেয়ে দুই শিক্ষার্থী বুঝতে পারেন তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। বেতন চাইতে গেলে ফোন ধরে মায়া উল্টো ভয়ভীতি দেখান তাদের।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এমন অভিজ্ঞতা শুধু সিফাত ও সৌরভের নয়। বিভিন্ন জেলা থেকে এসে প্রতারিত হয়েছেন আরও অনেকে।
পাবনার জাকির হোসেন, সিরাজগঞ্জের আলী রাজ, জয়পুরহাটের হোসাইন আলী, খুলনার বর্ষা, টাঙ্গাইলের আতোয়ার রহমান, ঢাকার জুয়েল, সাভারের আফজাল, হেমায়েতপুরের মীম, ফারুক, জিয়াসমিন, লিওনসহ আরও অনেকে।
তাদের সবার অভিযোগ- চাকরি দেওয়ার নামে ১০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ‘জামানত’, ‘ইউনিফর্ম’ ও ‘ফরম’ বাবদ টাকা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বেশিরভাগই এক-দুই মাস কাজ করলেও বেতন পাননি। কেউ টাকা চাইলে ইকবাল ও মায়া হুমকি-ধামকি দিয়ে অফিস থেকে বের করে দিতেন।
পাবনার জাকির হোসেন বলেন, “৩০ হাজার টাকা বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমার কাছ থেকে ২০,০০০ জামানত ও ৩,৫০০ টাকার ইউনিফর্মের টাকা নেয়। কাজে যোগ দেওয়ার পর বুঝলাম সবই মিথ্যে। টাকা চাইলেই ইকবাল আচরণ খারাপ করে। তিন মাসেও আমার টাকা ফেরত দেয়নি।”
জানা যায়, ২০১৮ সালে মানিকগঞ্জ শহরের উত্তর সেওতা এলাকায় অফিস খুলে একই কায়দায় প্রতারণা চালায় এই চক্র। পরে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গিয়ে আবারও বহু মানুষের সাথে প্রতারণা করে। স্থানীয়দের চাপ বাড়লে চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাতারাতি অফিস গুটিয়ে পালিয়ে আসে ইকবাল ও মায়া। এরপর সিংগাইরে নতুন করে প্রতারণার জাল ফেলেন।
প্রতিষ্ঠানটির সাবেক মার্কেটিং ম্যানেজার রফিকুল আলম লাভু জানান, “এ প্রতিষ্ঠান পুরোপুরিই ভুয়া। কোনো কাগজপত্র নেই। ভুয়া নিয়োগ দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়। আমার নিজেরই ৯৬ হাজার টাকা পাওনা আছে। আমার কাছে ২৫-৩০ জন ভুক্তভোগীর তথ্য আছে, যাদের সবার কাছ থেকেই টাকা নিয়েছে ইকবাল ও মায়া।”
স্থানীয় বাসিন্দা রমজান আলী বলেন, “প্রতিদিনই ভুক্তভোগীরা টাকা চাইতে আসে। ইকবাল উল্টো তাদের হুমকি দেয়। এসব প্রতারকদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা উচিত।”
তবে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ইকবাল হোসেন সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ``আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠাণে বেকার তরুণ-তরুণীদের চাকরির ব্যবস্থা করে কিছু কমিশন নেই। এর বাইরে জামানত ও ইউনিফরম বাবদ কিছু টাকা নেওয়া হয়। অনেকের কাজ ভাল না লাগায় চাকরি ছেড়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠানের নামে মিথ্যা-ভিত্তিহীন কথা বলতে পারে। যদি কারও কিছু পাওনা থাকে তাহলে দিয়ে দেব।”
সিংগাইর উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, “এ বিষয়ে অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
চাকরির নামে প্রতারণা এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বেকার তরুণ-তরুণীদের অসহায়ত্ব পুঁজি করে একটি চক্র প্রতারণার জাল বিছিয়ে দিনের পর দিন প্রতারণা করে যাচ্ছে। সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং সবার সচেতনতাই একমাত্র পথ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।