স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গর্বিত কণ্ঠসৈনিক, বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের প্রখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী, প্রযোজক, সুরকার ও সংগীত পরিচালক – বিপুল ভট্টাচার্য ছিলেন আমাদের গানের এক অকৃত্রিম যোদ্ধা, যিনি গানকে করেছেন জীবনসংগ্রামের হাতিয়ার।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৩ সালের ২৫শে জুলাই, কিশোরগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া শহরে। পিতা নগেশ ভট্টাচার্য ও মাতা হেমপ্রভা দেবীর সর্বকনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তার ঝোঁক, যার সূচনা দিদিমার মুখে শোনা ঘুমপাড়ানি গান থেকে। পরবর্তীতে মায়ের উৎসাহে শুরু হয় তার আনুষ্ঠানিক সংগীতচর্চা।
তিনি সংগীতের পাঠ গ্রহণ করেন ওস্তাদ অমর চন্দ্র শীল, অশ্বিনী কুমার রায়, সুখেন্দু চক্রবর্তী ও নিত্যা রায়ের কাছে। অল্প বয়সেই প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে জেলাভিত্তিক সংগীত প্রতিযোগিতায় বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার প্রতিনিধিত্ব করে পরপর দুইবার চ্যাম্পিয়ন হন।
* ১৯৬৭ সালে নজরুল সংগীতে প্রথম ও গোল্ড মেডেল
* ১৯৬৯ সালে পল্লীগীতে প্রথম স্থান অধিকার
১৯৭১ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র-এ। তাঁর গাওয়া অনুপ্রেরণাদায়ক গান মুক্তিযোদ্ধাদের রণাঙ্গনে ও সাধারণ মানুষের মনে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিল। তিনি ছিলেন ‘মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’-র সক্রিয় সদস্য। যুদ্ধকালীন সময়ে ট্রাকে চড়ে ঘুরে ঘুরে তিনি শরণার্থী শিবিরে, মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে গান শুনিয়ে ছড়িয়েছেন সাহস আর প্রত্যয়ের আলো।
তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত গানগুলো হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের গান। যেমন –
🎵 “এই না বাংলাদেশের গান গাইতে রে আমার দুঃখ পরান কান্দে”
🎵 “বলো বলো রে বলো সবে বলো রে বাঙালির জয়”
🎵 “নাও ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে”
তারেক মাসুদের বিখ্যাত প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’-এ বিপুল ভট্টাচার্যের গাওয়া কোরাস গানগুলো যুদ্ধকালীন সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের দুর্লভ দলিল হয়ে আজও বাঙালির চেতনায় অম্লান।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশ বেতারে প্রথম সংগীত পরিবেশন করেন। এরপর বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে কাজ করেন।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের সদস্য। দেশ-বিদেশে গান গেয়ে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন বাংলার মাটির গন্ধ – কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপানসহ বহু দেশে।
তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সংগীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘মল্লিকা সংগীত সমারোহ বিদ্যায়তন’ এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সংগীত শেখানোর মাধ্যমে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রক্ষা করে গেছেন।
ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে আমাদের প্রিয় এই শিল্পী ২০১৩ সালের ৫ জুলাই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।
গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এই অকুতোভয় শব্দসৈনিককে – যিনি গানকে করেছেন জাতির জাগরণের অনন্য মাধ্যম।
"যতদিন বাংলা গান থাকবে, ততদিন বেঁচে থাকবেন বিপুল ভট্টাচার্য—বাঙালির কণ্ঠে, স্মৃতিতে ও শ্রদ্ধায়।"