বাংলা চলচ্চিত্র ও নাট্যমঞ্চে তাঁর অবদান স্মরণে রেখে আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে মাথা নত করি।
কালী বন্দ্যোপাধ্যায়—অভিনয়ে যিনি ছিলেন সত্যনিষ্ঠা ও বর্ণনাতীত সংবেদনশীলতার প্রতিচ্ছবি। বিচিত্র চরিত্রে অভিনয়ের দক্ষতায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের অনন্য মুখ, যাঁকে ঘিরে একসময় নির্মিত হয়েছে ছবি, নির্বাচিত হয়েছে গল্প।
স্মরণীয় কিছু সিনেমা:
ডাকহরকরা (১৯৫৮) – জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি, এশিয়ার প্রথম ফিচার ছবি যা মস্কো টিভিতে প্রচারিত হয়।
পরশপাথর, অযান্ত্রিক, নীল আকাশের নিচে, তিন কন্যা, হাঁসুলী বাঁকের উপকথা, লৌহকপাট, বাড়ি থেকে পালিয়ে, ক্ষুধা—প্রতিটি ছবিই কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের নান্দনিকতার নিদর্শন।
পরে গুরুদক্ষিণা, ছোট বউ–এর মতো বাণিজ্যিক ছবিতেও তিনি ছিলেন দাপুটে চরিত্রাভিনেতা।
মৃণাল সেনের বিতর্কিত ও নিষিদ্ধ ছবিতে চিনা চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তুতিতে গিয়ে চায়না টাউনে প্রায় গণধোলাইয়ের শিকার হয়েছিলেন। স্থানীয় চিনে যুবকদের সন্দেহ হয়েছিল, তিনি পুলিশের চর! নিজের পুরনো ছবির অ্যালবাম দেখিয়ে ব্যাখ্যা করে শেষমেশ বাঁচতে পেরেছিলেন, তাও এক বৃদ্ধ চিনেম্যানের কল্যাণে যিনি তাঁকে চিনেছিলেন 'ডাকহরকরা' ছবির মাধ্যমে।
‘বরযাত্রী’, ‘রিকশাওয়ালা’, ‘টনসিল’–এর মতো দুর্দান্ত অভিনয় থাকা সত্ত্বেও কাজ মিলছিল না। একসময় আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন। পাশে দাঁড়ান নির্মাতা সরোজ দে। তাঁর হাত ধরেই আসে ‘ডাকহরকরা’-র মতো সাফল্য।
সাফল্যের শিখরে পৌঁছে পারিশ্রমিক বাড়িয়ে ফেলেছিলেন, যা উত্তমকুমারের চেয়েও বেশি ছিল! কিন্তু অচিরেই মুখ ফিরিয়ে নেন প্রযোজকরা। পরে আবার জীবন ঘিরে ধরে অভাব। বাণিজ্যিক ছবিই তখন হয় অন্নসংস্থানের ভরসা।
গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জীবনের আদর্শ স্থির করেছিলেন। সাহসী রাজনীতি ও একগুঁয়ে মতাদর্শের কারণে বহু বিতর্কও তাঁকে ঘিরে ছিল। চীনের তিয়েনানমেন স্কোয়ারে ছাত্রদের উপর গুলিচালনার পর তিনি বলেছিলেন—
“বেশ করেছে গুলি চালিয়েছে... আমি কমিউনিস্ট। সাম্রাজ্যবাদের দালালদের ঘৃণা করি।”
বই ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। শুটিংয়ে গিয়েও যখন সবাই আড্ডায় ব্যস্ত, তখন তিনি হ্যারিকেনের আলোয় বই পড়তেন এক কোণে।
তাঁর মতো শক্তিশালী অথচ সংবেদনশীল অভিনেতা বাংলা সিনেমা খুব কমই পেয়েছে। শিশুসুলভ সরলতা আর কঠোর আদর্শে গড়া ছিল তাঁর জীবন।
৫ জুলাই, ১৯৯৩ খৃষ্টাব্দে তিনি উত্তরপ্রদেশের লখনউতে মারা যান।
একাধারে তিনি ছিলেন—নায়ক, চরিত্রাভিনেতা, গণনাট্যকর্মী, প্রগতিশীল চিন্তাবিদ এবং এক কালের গ্ল্যামার-আইকন।
প্রণতি জানাই সেই কালীবাবুকে,
যাঁর অভিনয় শুধু নয়, জীবনও ছিল এক প্রেরণার গল্প।