কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার গোপগ্রাম এ. জেড ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোঃ সাইদুল ইসলাম ও সহকারী শিক্ষক (বাংলা) শেখ মুহাম্মদ আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়ম, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকাবাসী।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২০১২ সালে অধ্যক্ষ হিসেবে মোঃ সাইদুল ইসলাম যোগদানের পর থেকেই বিভিন্ন অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও আর্থিক দুর্নীতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে অধ্যক্ষ সাইদুল ইসলাম ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী সহকারী শিক্ষক (বাংলা) শেখ মুহাম্মদ আব্দুর রহিম প্রতিষ্ঠান থেকে পালিয়ে জান।
অভিযোগে বলা হয়েছে, অধ্যক্ষ ও তার সহযোগী নিয়মিত মাদ্রাসায় উপস্থিত না থেকেও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন। এছাড়া ভুয়া ভাউচার তৈরি করে বিভিন্ন খাতে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
আরও অভিযোগ করা হয়, শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি, সেশন চার্জ, টিউশন ফি, রেজিস্ট্রেশন, ফরম পূরণ, মার্কশিট ও সনদপত্র বাবদ আদায়কৃত অর্থের বড় অংশ যথাযথ হিসাব ছাড়াই আত্মসাৎ করা হয়েছে। সুধিদের দেয়া দানের টাকা ও আত্মসাৎ করেন। মাদ্রাসার নামে থাকা প্রায় ২০ বিঘা জমির লিজ বাবদ গত ১৫ বছরে প্রায় ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, শিক্ষক-কর্মচারীদের টাইম স্কেল, উচ্চতর স্কেল ও পদোন্নতির নামে কয়েক লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত একাধিক শিক্ষকের কাছ থেকেও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সহকারী শিক্ষক (বাংলা) শেখ মুহাম্মদ আব্দুর রহিমের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি প্রথমে অফিস সহকারী হিসেবে যোগদান করলেও পরবর্তীতে শূন্য পদ না থাকা সত্ত্বেও সহকারী শিক্ষক পদে অবৈধভাবে নিয়োগ পান এবং পরে জাল নিবন্ধন সনদের মাধ্যমে এমপিওভুক্ত হন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মাদ্রাসার সম্পত্তি বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। খোকসা উপজেলার মানিককাট ও পাতালদৌড় মৌজায় মাদ্রাসার নামে থাকা জমি বিক্রির অর্থ যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা না দিয়ে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মাদ্রাসার কম্পিউটার ল্যাব নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ল্যাবের জন্য বরাদ্দকৃত কম্পিউটারগুলোর বেশ কয়েকটি গায়েব হয়ে গেছে এবং অবশিষ্ট কম্পিউটারগুলোর গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ খুলে বিক্রি করা হয়েছে। বিজ্ঞানাগারের জন্য বরাদ্দকৃত ৭৪ হাজার টাকা, ক্রীড়া সামগ্রী, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাটারি, ওজন মাপার যন্ত্র, সিলিং ফ্যানসহ বিভিন্ন সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
ল্যাব ইনচার্জ ঝর্ণা খাতুন এই "ল্যাবে আগে ২৫টি কম্পিউটার ছিল। আমাকে ল্যাব ইনচার্জ করা হলেও কখনও ল্যাবের চাবি দেওয়া হয়নি। বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি কম্পিউটার আছে, সেগুলোরও হার্ডডিস্ক, র্যামসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ নেই। শুধু মাদারবোর্ড পড়ে আছে।"
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, কম্পিউটার ল্যাবটি দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ধুলাবালিতে আচ্ছন্ন। অধিকাংশ কম্পিউটার অচল অবস্থায় রয়েছে এবং অনেক সিপিইউ খোলা অবস্থায় পড়ে আছে।
মাদ্রাসার শিক্ষক লিয়াকত আলী অভিযোগ করে বলেন, "মাদ্রাসার একটি বাথরুমের ফ্যানও অধ্যক্ষের বাড়ীতে নিজের বাথরুমে লাগানো হয়েছে।"
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শেখ মুহাম্মদ আব্দুর রহিম ডাচ-বাংলা ব্যাংকের একাধিক হিসাবে মাদ্রাসার অর্থ স্থানান্তর করে মোট প্রায় ৫৯ লাখ ৫৮ হাজার টাকার বেশি আত্মসাৎ করেছেন। এর মধ্যে নিজের কন্যার নামে থাকা একটি ব্যাংক হিসাবে টিউশন ফির কয়েক লাখ টাকা স্থানান্তরের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় গ্রামবাসী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও অনিয়ম চলে আসছে। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত অধ্যক্ষ মোঃ সাইদুল ইসলাম ও সহকারী শিক্ষক (বাংলা) শেখ মুহাম্মদ আব্দুর রহিমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি ঃ মীর রকিবুল ইসলাম
