বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

যেমন ছিল স্ত্রীদের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর সদ্ব্যবহার

যেমন ছিল স্ত্রীদের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর সদ্ব্যবহার

যেমন ছিল স্ত্রীদের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর সদ্ব্যবহার

ভালোবাসা শুধু মুখের কথায় প্রকাশ পায় না; বরং মানুষের আচরণ, সহনশীলতা, সহযোগিতা ও ছোট ছোট যত্নের মধ্য দিয়েই তার প্রকৃত প্রকাশ ঘটে। আর দাম্পত্য জীবনে এই বিষয়টির গুরুত্ব আরো বেশি।

স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের পোশাকস্বরূপ—তারা একে অপরের শান্তি, নিরাপত্তা ও মানসিক প্রশান্তির আশ্রয়। তাই ইসলামে বিয়ে নিছক সামাজিক সম্পর্ক নয়; এটি দায়িত্ব, অধিকার, ভালোবাসা ও দয়া-সহানুভূতির ওপর প্রতিষ্ঠিত এক পবিত্র বন্ধন। তাইতো আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)

এই আয়াত দাম্পত্য জীবনের একটি মৌলিক নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে।

স্ত্রীকে সম্মান করা, তার অনুভূতির মূল্য দেওয়া, তার ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা এবং সাধ্য অনুযায়ী তার প্রয়োজন পূরণ করা—সবই ‘সদ্ভাবে জীবনযাপন’-এর অন্তর্ভুক্ত। আর এই নির্দেশনার সবচেয়ে সুন্দর বাস্তব উদাহরণ ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। তিনি ছিলেন আল্লাহর রাসুল, রাষ্ট্রনায়ক, শিক্ষক ও উম্মতের পথপ্রদর্শক। এত বিপুল দায়িত্বের মাঝেও পরিবারের সদস্যদের অধিকার ও অনুভূতির প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত যত্নশীল।

আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবী (সা.)-কে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন। আপনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)

 

দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ হতে পারে, ভুল হতে পারে, কখনো এমন আচরণও দেখা দিতে পারে যা একজনকে কষ্ট দেয়। কিন্তু একজন উত্তম চরিত্রের মানুষের পরিচয় তখনই প্রকাশ পায়, যখন সে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিজের উত্তম চরিত্র ধরে রাখতে পারে। আল্লাহ বলেন, ‘ভালো ও মন্দ সমান নয়।

তুমি মন্দকে প্রতিহত করো যা উত্তম তা দিয়ে।’ ‘এ গুণ শুধু তারাই লাভ করে, যারা ধৈর্য ধারণ করে।’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ৩৪-৩৫)

 

তাই স্ত্রীর কোনো আচরণে কষ্ট পেলেই প্রতিশোধ নেওয়া বা কঠোর হয়ে যাওয়া ইসলামের আদর্শ নয়। বরং পরিস্থিতি বুঝে ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা উত্তম চরিত্রের পরিচয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাম্পত্য জীবনের অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো—তিনি ঘরের কাজে পরিবারকে সহযোগিতা করতেন। ঘরের কাজকে তিনি নিজের মর্যাদার পরিপন্থী মনে করতেন না। বরং পরিবারের কাজে অংশ নেওয়াকেও তিনি স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। হজরত আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নবী (সা.) ঘরে কী করতেন? তিনি বলেন, ‘তিনি তাঁর পরিবারের কাজে নিয়োজিত থাকতেন।’ (সহিহ বুখারি)

দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য অর্থ-সম্পদ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সময়, মনোযোগ ও আন্তরিক কথোপকথন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাদের কথা শুনতেন এবং তাদের অনুভূতির প্রতি গুরুত্ব দিতেন। হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ কথোপকথনের ঘটনাও হাদিসে এসেছে। এ থেকে বোঝা যায়, পরিবারের মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়; বরং এটি ভালোবাসা ও সম্পর্ক দৃঢ় করার অন্যতম মাধ্যম।

আজ অনেক পরিবারে একই ঘরে থেকেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। একে অপরের সঙ্গে কথা বলার সময় নেই, মনের কথা শোনার সুযোগ নেই। অথচ সুন্দর একটি কথা, কিছুটা সময় দেওয়া কিংবা মনোযোগ দিয়ে সঙ্গীর কথা শোনা—দাম্পত্য জীবনে অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল, কিন্তু তাঁর জীবন ছিল আনন্দহীন বা নিরস নয়। তিনি তাঁর স্ত্রীদের বৈধ আনন্দ ও বিনোদনের প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দিতেন। হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে তাঁর দৌড় প্রতিযোগিতার ঘটনা সুপরিচিত। একবার আয়েশা (রা.) তাঁকে দৌড়ে পরাজিত করেন। পরবর্তী সময়ে আরেকবার দৌড় হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ছাড়িয়ে যান এবং মজার ছলে আগের ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
(সুনান আবু দাউদ)

রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও ভালোবাসার এমন অনেক দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, যা দাম্পত্য জীবনের কোমল সৌন্দর্য প্রকাশ করে। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, তিনি যে পাত্র থেকে পান করতেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সেই একই স্থান থেকে পান করতেন যেখান থেকে তিনি পান করেছিলেন। একইভাবে তিনি যে হাড় থেকে মাংস খেতেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তার একই স্থান থেকে খেতেন। (সহিহ মুসলিম)

ঈদের দিনে মসজিদে হাবশিদের বর্শা-খেলা প্রদর্শনের ঘটনা হাদিসে এসেছে। হজরত আয়েশা (রা.) সেই খেলা দেখতে চেয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে দেখতে দেন এবং তিনি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তাঁর জন্য অপেক্ষা করেন। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

স্ত্রীদের মধ্যে স্বাভাবিক ঈর্ষা বা অভিমান প্রকাশ পেলেও রাসুলুল্লাহ (সা.) তা ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে মোকাবিলা করতেন। তিনি প্রতিটি পরিস্থিতিতে উত্তেজিত হয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতেন না। এখানে স্বামীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে—জীবনসঙ্গী একজন মানুষ; তারও আবেগ, অভিমান, ভালো লাগা ও কষ্ট রয়েছে। তাই প্রতিটি ভুলকে অপরাধ হিসেবে না দেখে কখনো কখনো মানবিক দুর্বলতা হিসেবেও দেখতে হয়। তবে এর অর্থ অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। ইসলাম যেমন সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে, তেমনি ন্যায় ও আল্লাহর নির্ধারিত সীমা রক্ষারও নির্দেশ দিয়েছে। প্রয়োজন হলে ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু সংশোধনের পদ্ধতিতেও থাকতে হবে প্রজ্ঞা, কোমলতা ও ন্যায়পরায়ণতা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতেন, আবার তাঁদের অধিকার রক্ষায় ন্যায়বিচারও করতেন। একাধিক স্ত্রী থাকায় তিনি সময় ও পালার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার বজায় রাখতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের কাছে যেতেন, তাদের সঙ্গে কথা বলতেন এবং যার পালা ছিল তার কাছে রাতযাপন করতেন। (সুনান আবু দাউদ)

মানুষ মাত্রই ভুল করে। স্বামী যেমন ভুল করতে পারেন, স্ত্রীও তেমনি ভুল করতে পারেন। তাই সংসারে সুখী হতে হলে একে অপরের ভুল সহ্য করার মানসিকতা থাকতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)

বাইরের মানুষের সামনে হাসিমুখে থাকা সহজ; কিন্তু দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গীর সঙ্গে ধৈর্য ধরে, সম্মান দিয়ে ও ভালোবাসা নিয়ে চলা অনেক বেশি কঠিন। তাই ঘরেই মানুষের উত্তম চরিত্রের প্রকৃত পরীক্ষা হয়। স্ত্রীর সঙ্গে ভালো কথা বলা, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, প্রয়োজনে ঘরের কাজে সহযোগিতা করা, তার পছন্দকে সম্মান করা, ভুলত্রুটি ক্ষমা করা, বৈধ আনন্দে অংশ নেওয়া এবং রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা—এসবই দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্য বাড়ায়। একইভাবে স্ত্রীও স্বামীর প্রতি সম্মান, সহযোগিতা, ভালোবাসা ও সদ্ব্যবহার প্রদর্শন করবেন। কারণ কোরআন দাম্পত্য সম্পর্ককে একতরফা অধিকার নয়; বরং পারস্পরিক দায়িত্ব ও অধিকারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নারীদেরও ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের ওপর ন্যায়সংগত দায়িত্ব রয়েছে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২৮)

আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রত্যেককে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে পরিবারে উত্তম চরিত্র, ভালোবাসা, দয়া ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার তাওফিক দান করুন। আমিন।