মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর পর নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এই যুদ্ধকে ঘিরে গত কয়েকদিনে রাশিয়া ও ইউক্রেনের পদক্ষেপের তথ্যও সামনে এসেছে। দেশগুলোর কর্মকাণ্ডের প্রভাব পড়ছে জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে।
মূল যুদ্ধক্ষেত্র ইরানে রোববার সকাল পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত ছিল। নতুন কোনো মার্কিন হামলার খবর পাওয়া যায়নি। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে উভয়পক্ষ আলোচনায় ফিরতে পারে বলে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধবিরতি হোক বা না হোক, সংঘাতের ফলে যে ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা অন্য জায়গায় উত্তেজনা উসকে দিচ্ছে।
এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে ইরানের হামলার কারণে তেল ও সার তৈরির কাঁচামাল রপ্তানিতে কড়া নিষেধাজ্ঞা নেমে এসেছে। জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কিছু দেশে খাদ্য নিরাপত্তা সংকটের ঝুঁকি বেড়েছে।
হুতিরা ইয়েমেনের উত্তর ও পশ্চিমের বেশিরভাগ অংশ ও রাজধানী সানা নিয়ন্ত্রণ করে। ২০১৫ সালে সৌদি আরব ও তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা হুতিদের বিরুদ্ধে নৃশংস যুদ্ধে জড়ায়। যা ২০২২ সালের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে শান্ত হয়। চলতি মাসে সানা বিমানবন্দরে একটি হামলার জেরে রিয়াদ ও হুতিদের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়। জবাবে হুতিরা সৌদিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। গত সোমবার সৌদির বিরুদ্ধে হুতিরা নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। শুক্রবার হুতিদের নিয়ন্ত্রিত হোদেইদা শহরে বিমান হামলা চালায় রিয়াদ।
পাল্টাপাল্টি এই হামলা রোববার পর্যন্ত গড়িয়েছে। এদিন সৌদির উপকূলীয় শহর জিজান ও ইয়ানবুতে রাষ্ট্র মালিকানাধীন তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনায় হামলা করেছে হুতিরা। জিজানে তেল শোধনাগারে কতটুকু ক্ষতি হয়েছে সে বিষয়ে সৌদির পক্ষ থেকে এখনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে হামলার পর আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে।
ইয়ানবুতে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে সৌদিতে মোতায়েন থাকা গ্রিসের সেনাবাহিনী। সংঘাত বাড়তে থাকায় এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে, হুতিরা লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। হরমুজের পাশাপাশি এই প্রণালিও বন্ধ হলে বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে।
জট পাকানো যুদ্ধ
ইরান যুদ্ধ লোহিত সাগরে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি এর সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেরও জট পেকেছে। বর্তমানে ইউরোপের এই লড়াই বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাতে পরিণত হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার কাস্পিয়ান সাগরে তাদের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় এক নাবিক নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেছেন, এই হামলার মাধ্যমে কিয়েভ খুবই গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। ইরানি জাহাজটি সামরিক পণ্য পরিবহনে ব্যবহার হচ্ছিল।
ওই পোস্টে জেলেনস্কি দাবি করেন, উপসাগরীয় দেশ ও সেখানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনার ওপর রাশিয়া স্যাটেলাইট নজরদারি শুরু করেছিল। বিষয়টি চলতি মাসের শুরুর দিক থেকে খেয়াল করছে কিয়েভ। রাশিয়া ওই স্যাটেলাইট ছবিগুলো ইরানকে পাঠিয়েছিল। সেগুলো দেখে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সঙ্গে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুক্ত হওয়ার এমন খবর, যুদ্ধে এক ধরনের জট পাকিয়েছে। এমন সময়ে ইরানে হঠাৎ হামলা বন্ধ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর কারণ উল্লেখ না করলেও তাঁর প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প সবসময়ই কূটনীতিকে গুরুত্ব দেন।
অপরদিকে তেহরান থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক রেসুল সরদার জানিয়েছেন, দুই পক্ষ বার্তা বিনিময় করছে। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তেহরান সেগুলো পর্যালোচনা করছে। তবে কিছু মৌলিক পার্থক্য এবং অবিশ্বাসের কারণে এখনও তেমন অগ্রগতি হয়নি।
