হিন্দি চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রাণবন্ত অভিনয়, মোহনীয় হাসি, দুর্দান্ত নৃত্যশৈলী এবং অনন্য ফ্যাশন সচেতনতার জন্য খ্যাত কিংবদন্তি অভিনেত্রী মুমতাজ-এর ৭৯তম জন্মদিনে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।
মুমতাজ আস্কারি মাধবানি, যিনি সবার কাছে শুধু মুমতাজ নামেই পরিচিত, ১৯৪৭ সালের ৩১ জুলাই তৎকালীন বোম্বে (বর্তমান মুম্বই)-এ এক ইরানি বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন আব্দুল সেলিম আস্কারি, একজন শুষ্ক ফলের ব্যবসায়ী এবং মা শাব্দি হাবিব আগা। খুব অল্প বয়সেই পারিবারিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। মাত্র এক বছর বয়সেই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে এবং ১৬ বছর বয়সে মাকে হারান। জীবনের কঠিন বাস্তবতাই তাঁকে খুব ছোটবেলায় চলচ্চিত্র জগতে কাজ শুরু করতে উদ্বুদ্ধ করে।
মাত্র পাঁচ বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন মুমতাজ।
তবে সফলতার শিখরে পৌঁছাতে তাঁকে দীর্ঘদিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। ছোট ছোট চরিত্র, স্টান্ট ও বি-গ্রেড চলচ্চিত্রে অভিনয় করেও তিনি কখনও হাল ছাড়েননি। নিজের প্রতিভা, পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাসের জোরেই তিনি একসময় বলিউডের প্রথম সারির নায়িকাদের কাতারে স্থান করে নেন।
১৯৬৯ সালে সুপারস্টার রাজেশ খান্না-র বিপরীতে অভিনীত 'দো রাস্তে' চলচ্চিত্র তাঁকে রাতারাতি তারকাখ্যাতি এনে দেয়। এরপর রাজেশ খান্নার সঙ্গে তাঁর জুটি বলিউডের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় জুটি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তাঁদের একসঙ্গে অভিনীত 'সচ্চা ঝুঠা', 'আপ কি কসম', 'প্রেম কাহানি', 'রোটি', 'বন্ধন'-সহ একাধিক ছবি বক্স অফিসে ব্যাপক সাফল্য লাভ করে।
রাজেশ খান্না ছাড়াও তিনি ধর্মেন্দ্র, শাম্মী কাপুর, শশী কাপুর, জিতেন্দ্র, মনোজ কুমার, রাজ কুমার, সঞ্জীব কুমার, ফিরোজ খানসহ সেই সময়ের প্রায় সব জনপ্রিয় নায়কের বিপরীতে অভিনয় করেছেন।
মুমতাজের অভিনীত 'খিলোনা' (১৯৭০) চলচ্চিত্র তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাইলফলক। এই ছবিতে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া 'হরে রামা হরে কৃষ্ণা', 'আপনা দেশ', 'লোফার', 'ব্রহ্মচারী', 'রাম অউর শ্যাম', 'চোর মচায়ে শোর' প্রভৃতি ছবিও তাঁকে অমর করে রেখেছে।
শুধু অভিনয় নয়, ফ্যাশনেও তিনি ছিলেন এক যুগান্তকারী ব্যক্তিত্ব। 'ব্রহ্মচারী' ছবির জনপ্রিয় গান "আজ কাল তেরে মেরে পেয়ার কে চর্চে"-তে শাম্মী কাপুরের সঙ্গে তাঁর নৃত্য এবং শিফন শাড়ির স্টাইল সেই সময় ভারতীয় ফ্যাশনে এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তীকালে তাঁর শাড়ি পরার ধরন অসংখ্য নারীর অনুকরণের বিষয় হয়ে ওঠে।
তাঁর অভিনীত "ইয়ে রেশমি জুলফেঁ", "জয় জয় শিব শঙ্কর", "বিন্দিয়া চমকেগি", "আজ কাল তেরে মেরে পেয়ার কে চর্চে"-এর মতো অসংখ্য গান আজও সমান জনপ্রিয় এবং বলিউডের চিরসবুজ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা।
একসময় কিংবদন্তি অভিনেতা শাম্মী কাপুর তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু বিয়ের পর অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার শর্ত থাকায় তিনি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। পরে ১৯৭৪ সালের ২৯ মে উগান্ডার শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী ময়ুর মাধবানি-কে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই কন্যা—নাতাশা মাধবানি ও তানিয়া মাধবানি। বড় মেয়ে নাতাশা অভিনেতা ফারদিন খান-এর সহধর্মিণী।
অভিনয় থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে লন্ডনে বসবাস করছেন। চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড-এ সম্মানিত হন।
বলিউডের ইতিহাসে মুমতাজ শুধু একজন সফল অভিনেত্রী নন; তিনি এক অনন্য স্টাইল আইকন, অসাধারণ নৃত্যশিল্পী এবং পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ও সাফল্যের এক অনুপ্রেরণাময় প্রতীক। তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং ফ্যাশনের আবেদন আজও সমানভাবে দর্শকদের মুগ্ধ করে।
৭৯তম জন্মদিনে কিংবদন্তি অভিনেত্রী মুমতাজের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও সুখী জীবন কামনা করছি।
শুভ জন্মদিন, মুমতাজ।