একসময় দক্ষিণাঞ্চলের নৌ-যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনের প্রাণ ছিল তেতুলিয়া নদী। নদীকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কালাইয়া বন্দর, কালাইয়া লঞ্চঘাট এবং ঢাকা-কালাইয়া ও কালাইয়া-লালমোহন নৌরুট আজ নাব্যতা সংকটে কার্যত হুমকির মুখে। নদীর বিভিন্ন স্থানে চর জেগে ওঠায় নৌযান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে আঞ্চলিক অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, মৎস্য খাত এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর কাঁদো নদী কাঁদো গ্রন্থে নদীকে মানুষের আশা, বেদনা ও জীবনসংগ্রামের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তেতুলিয়া নদীর বর্তমান বাস্তবতা যেন সেই সাহিত্যিক চিত্রকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, ট্রলার মালিক ও জেলেদের অভিযোগ, নদীর তলদেশে ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পণ্যবাহী কার্গো ও ট্রলার নিরাপদে চলাচল করতে পারছে না। অনেক সময় ডুবোচরে ধাক্কা লেগে নৌযান ও পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নাজিরপুর এলাকা থেকে লালমোহনগামী ট্রলারগুলোকে বর্ষা মৌসুমেও নাব্যতা সংকটের কারণে প্রায় ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে সময় ও জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, পাশাপাশি যাত্রীদের দুর্ভোগও বাড়ছে।
ঢাকা-কালাইয়া রুটে চলাচলকারী লঞ্চ সংশ্লিষ্টরা জানান, নদীর বিভিন্ন স্থানে নাব্যতা কমে যাওয়ায় নিরাপদে লঞ্চ চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
এদিকে নাব্যতা সংকটের কারণে গোলাচিপা, দশমিনা, কালাইয়া, নিমদী, নুরাইপুর ও কালিশুরীসহ দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক নৌঘাটে দ্বিতল লঞ্চ চলাচল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে কালাইয়া থেকে ঢাকাগামী মাত্র একটি দ্বিতল লঞ্চ চলাচল করছে।
ওই লঞ্চের প্রথম শ্রেণির মাস্টার মো. হানিফ বলেন, “একসময় ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের এই নৌরুটে অসংখ্য স্টেশন ছিল। এখন নাব্যতা সংকটের কারণে প্রায় ৯০ শতাংশ স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে যাত্রীসংখ্যা কমে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একাধিকবার পরিদর্শন করে আশ্বাস দিলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) তেতুলিয়া নদীতে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করলেও যেখানে নাব্যতা সংকট সবচেয়ে প্রকট, সেখানে পর্যাপ্ত খনন করা হচ্ছে না। বরং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আবেদনের ভিত্তিতে বাড়িঘর ও ভিটা ভরাটের জন্য বালু সরবরাহে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে সরকারের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে বিআইডব্লিউটিএর হাইড্রো সলিউশনের প্রকৌশলী তানভীর মজুমদার বলেন, “সরকারি বিধি অনুসারে আবেদনকারীদের বালু দেওয়া হয়। আবেদন যাচাই করেই বালু সরবরাহ করা হয় এবং এ জন্য কোনো অর্থ নেওয়া হয় না।”
স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে তেতুলিয়া নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা গেলে কালাইয়া বন্দর, কালাইয়া লঞ্চঘাট, চন্দ্রদ্বীপসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে স্বাভাবিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন সম্ভব হবে। পাশাপাশি জেলেরা নির্বিঘ্নে মাছ আহরণ করতে পারবেন এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও গতিপ্রবাহও বজায় থাকবে।
অন্যদিকে বাউফল উপজেলার সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক, সেতু ও আবাসন নির্মাণে ভিটি বালুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত বালু সরবরাহ না থাকায় অনেক উন্নয়নকাজও ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ বলেন, “তেতুলিয়া নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে কালাইয়া বন্দর ও যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী, ট্রলার মালিক, জেলে ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, পরিবেশগত ও আইনগত বিধান মেনে জরুরি ভিত্তিতে তেতুলিয়া নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। তাদের বিশ্বাস, নদীর প্রাণ ফিরে এলে শুধু নৌ-যোগাযোগ নয়, দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, মৎস্য খাত এবং জনজীবনও নতুন গতি ফিরে পাবে।
মোঃ রুবেল হোসেন, উপজেলা প্রতিনিধি
