দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গীতের ইতিহাসে কিছু কণ্ঠ আছে, যেগুলো শুধু গান গায় না—একটি যুগের আবেগ, স্মৃতি ও ইতিহাসকে কণ্ঠ দেয়। নূর জাহান ছিলেন তেমনই এক অনন্য শিল্পী। তাঁর কণ্ঠের জাদু ভারতীয় উপমহাদেশের সীমানা পেরিয়ে কোটি কোটি শ্রোতার হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।
আজ কিংবদন্তি এই শিল্পীর জন্মদিন। জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও শুভেচ্ছায় স্মরণ করছি উপমহাদেশের কালজয়ী শিল্পী মাদাম নূর জাহানকে।
শৈশব থেকেই সঙ্গীতের পথে যাত্রা
নূর জাহানের জন্ম ২১ সেপ্টেম্বর ১৯২৬ সালে, ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের কাসুরের নিকটবর্তী কোট মুরাদ খান এলাকায়। তাঁর জন্মনাম ছিল আল্লাহ ওয়াসাই। তিনি এক সঙ্গীতনির্ভর পরিবারে জন্মেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর অসাধারণ গানের প্রতিভা প্রকাশ পেতে শুরু করে এবং মাত্র কয়েক বছর বয়সেই সঙ্গীতের তালিম গ্রহণ করেন।
শৈশবে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় আসার পর তাঁর শিল্পীজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। মাত্র নয় বছর বয়সে তিনি কলকাতায় গানের জগতে আত্মপ্রকাশ করেন। ধীরে ধীরে শিশু শিল্পী হিসেবে গান ও অভিনয়ের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন এবং পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী।
গায়িকা থেকে অভিনেত্রী
নূর জাহান শুধু অসাধারণ গায়িকাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সফল অভিনেত্রী, সুরকার ও চলচ্চিত্র পরিচালকও।
ব্রিটিশ ভারতের চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় ও গান—দুই ক্ষেত্রেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে—
খানদান
জীনত
আনমোল ঘড়ি
জুগনু
মির্জা সাহিবান
দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তানে চলে যান এবং সেখানকার চলচ্চিত্রজগতে নতুন করে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
১৯৫১ সালে ‘চান ওয়ে’ (Chan Wey) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁকে পাকিস্তানের প্রথম নারী চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
‘মালিকা-ই-তারান্নুম’—সুরের রানি
নূর জাহানের কণ্ঠ ছিল অসাধারণ শক্তিশালী, আবেগময় এবং বহুমাত্রিক। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, গজল, চলচ্চিত্রের গান, পাঞ্জাবি লোকগীতি—বিভিন্ন ধারায় তিনি সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
তাঁকে পাকিস্তানে দেওয়া হয় ঐতিহাসিক উপাধি—
“মালিকা-ই-তারান্নুম”
অর্থাৎ “সুরের রানি”।
তাঁর ছয় দশকেরও বেশি দীর্ঘ শিল্পীজীবনে তিনি প্রায় ১০,০০০ গান রেকর্ড করেছেন বলে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। উর্দু, পাঞ্জাবি ও সিন্ধিসহ বিভিন্ন ভাষায় তাঁর গান রেকর্ড হয়েছে।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধ ও দেশাত্মবোধক গান
নূর জাহানের শিল্পীজীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হলো ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাঁর দেশাত্মবোধক গান।
রেডিও পাকিস্তারের মাধ্যমে প্রচারিত তাঁর দেশাত্মবোধক গানগুলো সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং পাকিস্তানের জনমানসে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। পাকিস্তানের সরকারি বার্তা সংস্থা ও Citizens Archive of Pakistan-ও তাঁর এই ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছে।
সম্মাননা ও পুরস্কার
সঙ্গীত ও অভিনয়ে অসামান্য অবদানের জন্য নূর জাহান পেয়েছেন বহু সম্মাননা। তাঁর উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রীয় সম্মানগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- প্রাইড অব পারফরম্যান্স
- তমঘা-ই-ইমতিয়াজ
- সিতারা-ই-ইমতিয়াজ
এছাড়াও তিনি পেয়েছেন একাধিক নিগার অ্যাওয়ার্ড এবং বিভিন্ন আজীবন সম্মাননা।
কণ্ঠের যে জাদু আজও অমলিন
নূর জাহানের গান শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের জনপ্রিয় গান হয়ে থাকেনি। তাঁর কণ্ঠের আবেগ, উচ্চারণ, সুরের নিয়ন্ত্রণ এবং গানের কথাকে অনুভব করে পরিবেশন করার ক্ষমতা তাঁকে পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের কাছেও অনুপ্রেরণার উৎস করে তুলেছে।
তাঁর কণ্ঠে প্রেম যেমন পেয়েছে গভীরতা, তেমনি বিরহ পেয়েছে বিষণ্ণ সৌন্দর্য; দেশাত্মবোধক গান পেয়েছে আবেগের শক্তি, আর গজল পেয়েছে এক অনন্য মাধুর্য।
দীর্ঘ শিল্পীজীবনে তিনি ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশের চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতজগতের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা একটি সাংস্কৃতিক সেতু হয়ে উঠেছিলেন।
২৩ ডিসেম্বর ২০০০ সালে করাচিতে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু একজন শিল্পীর মৃত্যু তাঁর কণ্ঠের মৃত্যু নয়। নূর জাহানের গান আজও দুই বাংলাসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে সমানভাবে স্মরণীয়।
আজ তাঁর জন্মদিনে তাই তাঁকে শুধু একজন গায়িকা হিসেবে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রের এক ঐতিহাসিক কিংবদন্তি হিসেবে স্মরণ করি। নূর জাহান—একটি নাম, একটি যুগ, একটি অমর কণ্ঠ।
শুভ জন্মদিন, মালিকা-ই-তারান্নুম!
আপনার কণ্ঠের মায়া, আপনার গান এবং আপনার শিল্পীসত্তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকুক।
কিংবদন্তি নূর জাহানের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
বিনোদন প্রতিবেদক
মোহিত লাল সাহা