মাগুরার তৃণমূল বিএনপি নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনার অভিযোগ তুলে সক্রিয় রাজনীতি থেকে চিরতরে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন মাগুরা জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল। শুক্রবার মধ্যরাতে তার নিজের ফেসবুক আইডিতে এক আবেগঘন পোস্টে তিনি এই ঘোষণা দেন।
বক্তব্যে কাজী কামাল লেখেন, ২০০৮ সালের পর থেকে তিনি রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে ছিলেন। ২০১৭ সালে একটি মিথ্যা মামলায় তাকে কারাবরণ করতে হয়। দীর্ঘ প্রায় সাত বছর কারাবাস শেষে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর অসুস্থ শরীরে ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
কারামুক্তির দিন মাগুরার নেতাকর্মীদের ভালোবাসা ও আবেগ তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আপনাদের চোখের পানি আমাকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিল।”
মুক্তির পর গত ১৬ মাসে মাত্র পাঁচবার মাগুরায় আসার সুযোগ হয়। মহাম্মদপুর, আড়পাড়া, সিংড়া,শত্রুজিৎপু ও বুনাগাতি কলেজ মাঠে আয়োজিত সংবর্ধনাগুলোতে অংশ নিয়ে তিনি তৃণমূল নেতাকর্মীদের চোখে দীর্ঘ ১৬ বছরের কষ্ট ও বেদনার প্রতিফলন দেখেছেন বলেও উল্লেখ করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৬ থেকে ১৭ বছর ধরে মামলা, হামলা, জেল ও নির্যাতন সহ্য করেও যারা মাগুরার মাটিতে বিএনপির পতাকা আগলে রেখেছেন, দলের হাই কমান্ড তাদের আবেগ ও মতামতের কোনো মূল্য দেয়নি।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে মাগুরা-২ আসনে এ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরীকে প্রাথমিক প্রার্থী ঘোষণার পর তৃণমূল পর্যায়ে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, তা হঠাৎ নয় বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনার ফল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বক্তব্যে বলা হয়, মাগুরা-২ আসনের ৫১৩ জন দায়িত্বশীল নেতার মধ্যে ৫০১ জন, ১৯টি ইউনিয়নের ১৮ জন সাবেক চেয়ারম্যান এবং দুইজন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান লিখিতভাবে মনোনয়নের বিরোধিতা করলেও দলীয়ভাবে তাদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “এটি কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল না। এটি ছিল অবহেলিত তৃণমূলের আর্তনাদ।” ছাত্রদল ও যুবদল থেকে উঠে আসা পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে বিতর্কিতদের পুনর্বাসনের চেষ্টা দলের আদর্শিক ভিত্তিকে দুর্বল করবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইসলামিক জাগরণের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ধর্মভীরু ভোটারদের একটি বড় অংশ জামায়াতে ইসলামির দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে—যা ভবিষ্যতে দলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে তৃণমূল নেতাকর্মীরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “তৃণমূলই দলের প্রাণ। হাজার হাজার ত্যাগী কর্মীকে উপেক্ষা করে একতরফা সিদ্ধান্ত নিলে দল শক্তিশালী হয় না, বরং ভেতর থেকে ক্ষয়ে যায়।”
আড়পাড়ার এক প্রতিবাদ সভার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, সেখানে তিনি শুধু দলের স্বার্থেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং নিজেকে নয়, অন্য যেকোনো যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার কথাও বলেছিলেন।
নেতাকর্মীদের অনুরোধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলেও পরিবারের একান্ত অনুরোধ এবং দীর্ঘ কারাবাসে পরিবারের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে তিনি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন ও সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, “তারুণ্যের জয় হোক, আপনারা এগিয়ে যান। তবে মনে রাখবেন—কর্মীদের চোখের পানি কখনো দলের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না।”
তিনি সকল নেতাকর্মীর জন্য দোয়া কামনা করে বলেন, আল্লাহ যেন সবাইকে এই কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণের শক্তি দান করেন।
