রাজধানী ঢাকার শনিবারের সকালটা ছিল বিষণ্ণ ধূসর। ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা জিয়া উদ্যান যেন নিজেই এক নীরব শোকের আবরণে আবৃত। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা আর কুয়াশাকে ছাপিয়ে একটি জায়গা মানুষের আবেগ, ভালোবাসা আর দীর্ঘশ্বাসের মোহনায় পরিণত হয়েছে- সেটি দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সমাধি।
ভালোবাসার টানে অদম্য যাত্রা
দাফনের চার দিন পেরিয়ে গেলেও প্রিয় নেত্রীর স্মৃতির টান কমেনি এতটুকুও। বরং তীব্র শীত ও কুয়াশাকে উপেক্ষা করে ভোর থেকেই মানুষ ছুটছেন সমাধিস্থলে। কেউ হাতে একগুচ্ছ ফুল নিয়ে, কেউবা শুধু একবুক শ্রদ্ধা আর নিঃশব্দ দোয়া নিয়ে। রাজধানীর নানা প্রান্ত ছাড়াও দেশের দূর-দূরান্তের জেলা-উপজেলা থেকে আসা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষের ভিড়ে মুখরিত ছিল পুরো উদ্যান এলাকা।
কবরের চারপাশ এখন ফুলের চাদরে ঢাকা। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর কেউ মাথা নিচু করে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকছেন, কেউবা অঝোরে কাঁদছেন। পাশের মাইক থেকে ভেসে আসা পবিত্র কোরআনের তিলাওয়াত পুরো পরিবেশকে এক অপার্থিব গাম্ভীর্য ও আবেগে পূর্ণ করে তুলেছে।
সমাধিস্থলে আসা রায়েরবাগের বাসিন্দা রাফিউল বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একজন নির্ভেজাল নেত্রী। তিনি নিজের জন্য কিছু চাননি, আজীবন দেশ আর মানুষের কথা বলেছেন। এখানে এসে মনে হচ্ছে, আমরা আমাদের ঋণের সামান্যটুকু শোধ করছি।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কর্মী মঞ্জুরুল ইসলাম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, খালেদা জিয়া তাদের কাছে শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রী নন, বরং বিশ্বাস ও সাহসের বাতিঘর। তাকে হারিয়ে শোকাতুর এক তরুণ কর্মী বলেন, ম্যাডামের চলে যাওয়া এখনো বিশ্বাস করতে পারি না। যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, তাকেই দেখে আসছি। তাঁর অভাব পূরণ হবার নয়।
জিয়া উদ্যানের এই সমাধিস্থলটি এখন কেবল একটি কবর নয়, এটি হয়ে উঠেছে রাজনীতি, আদর্শ আর স্মৃতির এক নীরব মিলনস্থল। বাবার হাত ধরে আসা শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ— সবার গন্তব্য এখন এই ঠিকানা। কেউ এখানে এসে নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে ঝালিয়ে নিচ্ছেন, কেউবা প্রিয় নেত্রীকে খুঁজে ফিরছেন চোখের জলে।
ঘন কুয়াশা হয়তো চারপাশকে আড়াল করে দিচ্ছে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের এই গভীর টানকে ঢেকে রাখতে পারছে না। সময় বয়ে যাচ্ছে, দিন গড়িয়ে রাত আসছে, কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের এই শেষ শ্রদ্ধার মিছিল থামছে না।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের আপসহীন নেত্রী এবং তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ৮০ বছর বয়সে গত ৩০ ডিসেম্বর ভোরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর এই প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, জিয়া উদ্যানে মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত ভিড়ই যেন তার সাক্ষী হয়ে থাকবে।
