দ্বীপজেলা ভোলার বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ মনপুরা। দুপুর ২টার পর থেকে সারাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এই দ্বীপের মানুষ। কারণ এ সময়ের পর এখান থেকে বের হওয়ার কোনো নৌযান চলে না। ফলে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ কার্যত রুদ্ধ হয়ে যায়। আর সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে একমাত্র সোলার মিনিগ্রিডটি বন্ধ থাকায় পুরো জনপদ ঢেকে যায় গাঢ় অন্ধকারে। বিদ্যুৎহীন এ জনপদের মানুষের তখন থাকে শুধু সকালের অপেক্ষা আর দীর্ঘশ্বাস। প্রায় এক বছর ধরে এহেন দুর্দশায় নিমজ্জিত মনপুরাবাসী। আধুনিক বাংলাদেশের মানচিত্রে থাকা এ দ্বীপ যেন প্রতি রাতে ফিরে যায় প্রাচীন সময়ে। মনপুরার জন্য মন পোড়ে না সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। দেশের সর্বত্র চলা উন্নয়নের আলোকরাশির মধ্যে এ যেন এক কৃষ্ণগহ্বর, অন্ধকারাচ্ছন্ন এক বিচ্ছিন্ন অংশ।
এই অন্ধকারে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হচ্ছে মানুষ। বিদ্যুৎ না থাকায় মনপুরার ৫০ শয্যার সরকারি হাসপাতালে জরুরি সেবা ব্যাহত হচ্ছে। গর্ভবতী নারী, অসুস্থ বৃদ্ধ কিংবা জটিল রোগীর জন্য নেই নিরাপদ চিকিৎসার নিশ্চয়তা। মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া যায় না, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রয়োজনের সময় সহায়তা চাওয়ার পথও হয়ে পড়ে সংকুচিত। সন্ধ্যার পর ঘরে বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই অনেক পরিবারের। এ অন্ধকার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কেড়ে নেওয়ার নামান্তরও। আলো না থাকায় নিয়মিত পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, পরীক্ষার প্রস্তুতি ভেঙে পড়ছে। ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন লোকসান গুনছেন; ফ্রিজ নষ্ট হচ্ছে, দোকানপাট আগেভাগেই বন্ধ রাখতে হচ্ছে, বাজার-হাটে থেমে যাচ্ছে কোলাহল। বিশেষত, শীতের এ সময়ে বিদ্যুৎহীন ঘরে রাত কাটানো হয়ে উঠেছে আরও কষ্টকর।
২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় স্থাপিত ১৭৭ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই সোলার মিনিগ্রিডটি একসময় ছিল মনপুরাবাসীর আলোর প্রতীক। ‘ওয়ার্ল্ড মডেল’ হিসেবে ঘোষিত সেই প্রকল্প এক বছর ধরে বন্ধ, ব্যাটারির মেয়াদ শেষ, বিকল্প ব্যবস্থা ঝুলে আছে কাগজে-কলমে। দায় নিচ্ছে না কেউ উদাসীনতা, প্রশাসনিক জটিলতা আর সিদ্ধান্তহীনতায় আটকে আছে মাসের পর মাস। আন্দোলন হয়েছে, দাবি উঠেছে বারবার; কিন্তু বিদ্যুতের আলো এখনও মনপুরায় ফেরেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১০ বছরেরও বেশি সময় আগে (২০১৫ সালের ২০ অক্টোবর) ভোলা জেলার মনপুরা উপজেলার ৩নং উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের বাংলাবাজারে ১৭৭ কিলোওয়াট সক্ষমতার একটি সোলার মিনিগ্রিড স্থাপন করা হয়। এই মিনি গ্রিড থেকে ভোলা জেলার মনপুরা উপজেলার ৩নং উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের বাংলা বাজার ও মাস্টারহাটসহ কয়েকটি গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। এক্ষেত্রে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৩৫ টাকারও বেশি করে ধরা হতো, যা সর্বোচ্চ। অনন্যোপায় দ্বীপবাসী তা মেনে নিয়েই বিদ্যুৎ ব্যবহার করতেন। কিন্তু গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে সোলার মিনিগ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ। ফলে কয়েকটি গ্রামের মানুষ হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎহীন। কবে আবার বিদ্যুৎ চালু হবে, সেটা নিয়েও রয়েছে যারপরনাই অনিশ্চয়তা। মিনিগ্রিড বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ইডকল ও বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় সোলার ইলেকট্রো বাংলাদেশ লিমিটেডের (এসইবিএল) উদ্যোগে স্থাপিত হয়েছিল।
উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের বাইরেও মনপুরা জুড়েই রয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান ডা. কবির সোহেল বলেন, একটি উপজেলার সামগ্রিক উন্নয়ন অনেকাংশেই বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ না থাকলে উন্নয়নের সুফল দৃশ্যমান হয় না। বর্তমানে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে আমাদের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
হাজিরহাট বাজারের ব্যবসায়ী মো. শামিম অভিযোগ করেন, আমরা দিনে-রাতে মিলিয়ে মাত্র রাত ১০টার দিকে দুই ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ পাই। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দোকানের ফ্রিজ নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু আমার নয়, বাজারের অধিকাংশ ব্যবসায়ীরই একই অবস্থা। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ব্যবসা পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিনিগ্রিড থেকে সাড়ে ৭ বছর বিদ্যুৎ দেওয়ার চুক্তি করা হয়েছিল। তবে আরও ২০ বছর বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব ছিল। জানা যায়, তিন-চার বছরের মধ্যে সেখানে ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) একটি তিন মেগাওয়াটের সোলার বিদ্যুৎকেন্দ্র করার কথা ছিল, যা বাস্তবায়ন হয়নি। এদিকে মিনিগ্রিড কেন্দ্রটির ব্যাটারির আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেলে সম্পূর্ণ কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়।
প্রায় এক দশক বিদ্যুতের সুবিধা পাওয়ার পর হঠাৎ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ দফায় দফায় বিক্ষোভ করলেও সংশ্লিষ্টদের কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
মিনিগ্রিড সোলার প্রকল্পটি আবার চালু করতে অন্য এলাকার সোলার বিদ্যুৎকেন্দ্রের অব্যবহৃত ব্যাটারি ব্যবহার করার চেষ্টা করলেও সরকারের সাড়া মিলেনি। ওজোপাডিকো তিন মেগাওয়াটের সৌরকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করলেও কার্যত তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
বিষয়টি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল করিম খানের দৃষ্টিগোচর করা হলে তিনি বলেন, ভোলার মনপুরায় যে সোলার মিনিগ্রিড বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল সেটা আমি জানি। তবে সেটি নষ্ট হওয়ায় মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে আছে তা জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে দেখব। দ্রুত এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
উদ্যোক্তা কোম্পানি এসইবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডিএম মজিবর রহমান বলেন, আমাদের সোলার মিনিগ্রিডের ব্যাটারির লাইফ টাইম শেষ হয়ে গেছে। আমরা সরকারের কাছে চিঠি লিখেছিলাম অন্য এলাকায় থাকা একটি গ্রিড থেকে অব্যবহৃত ব্যাটারি এনে মনপুরায় স্থাপন করতে। ওজোপাডিকো ব্যাটারি দিতে রাজি হলে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে তা বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) কাছে পাঠানো হয়। বোর্ড ৭৫ লাখ টাকা পরিশোধের শর্তে ব্যাটারি দিতে রাজি। কিন্তু ওয়েস্টজোন কোম্পানি বলছে, আমরা এত টাকা দিয়ে ব্যাটারি আনব না। ২০২৪ সালের ৭ জুলাই থেকে ব্যাটারি ও প্রকল্পের দুরবস্থা জানিয়ে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি। কোনো উত্তর পাইনি। তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে আইনগতভাবে আমরা বাধ্য নই। ওজোপাডিকো মনপুরায় তিন মেগাওয়াটের একটি সোলার কেন্দ্র স্থাপনের চেষ্টা করছে। তিন বছর আগে চালু হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা হয়নি। ওজোপাডিকোর কেন্দ্র চালু হলে আমরা আরও ২০ বছর গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করব।
এসইবিএল সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ওজোপাডিকোকে জানানো হয়, সোলার মিনিগ্রিডের সব ব্যাটারি প্রায় শতভাগ নষ্ট হয়ে গেছে। ২০২২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ওজোপাডিকোর সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী গ্রিড লাইন না হওয়ায় এবং ব্যাটারি ও ইনভার্টার নষ্ট হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে অস্থায়ীভাবে কেন্দ্রটি বন্ধ করার কথা জানানো হয়। মিনিগ্রিডের ব্যাটারির ওয়ারেন্টি পিরিয়ড ৭ বছর, কিন্তু এটি ব্যবহার করা হয়েছে ৯ বছর। ফলে সব ব্যাটারি অকেজো হয়ে গেছে। গ্রাহক পর্যায়ে রাতে বিদ্যুতের চাহিদা অত্যধিক, ডিজেল জেনারেটরের মাধ্যমে তা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ২৬টি মিনিগ্রিডের মধ্যে বিআরইবির আওতাধীন ১৯টি, ওজোপাডিকোর ৩টি, বিপিডিবির ৩টি এবং নেসকোর একটি রয়েছে। ওজোপাডিকোর আওতাধীন মনপুরা ১৭৭ কিলোওয়াট সোলার মিনিগ্রিড পুনরায় সচল করতে অন্যান্য মিনিগ্রিডের ৩৩৬টি ব্যাটারি ব্যবহার করা সম্ভব। তবে ব্যাটারির দাম বাবদ বিআরইবি ৭৫ লাখ টাকা দাবি করায় প্রকল্পটি চালু করা যায়নি।
ভোলার জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বলেন, মিনিগ্রিড কোম্পানির সোলার বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের দাম অনেক বেশিÑ এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগকে জানানো হবে, যেন সংকট দ্রুত সমাধান হয়।
মনপুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু মুসা বলেন, আমি অল্প সময় হলো এখানে যোগদান করেছি। কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎহীন থাকার খবর জেনেছি। দুয়েক দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলব এবং বিষয়টি ওপরে জানাব।
উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও জেলা বিএনপির সদস্য ডা. কামাল উদ্দিন বলেন, মনপুরায় বিদ্যুৎ সংকট সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের প্রধান কারণ। অনিয়মিত ও অপর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব খাত ক্ষতিগ্রস্ত। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক, যাতে নিরবচ্ছিন্ন ও টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
দ্বীপজেলা ভোলার মনপুরা উপজেলাটি একটি অফগ্রিড এলাকা। বর্তমানে এই উপজেলার ৪টি ইউনিয়নে মোট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। তিনটি ইউনিয়নের প্রায় তিন হাজার গ্রাহককে ৩টি সোলার মিনিগ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়Ñ দক্ষিণ সাকুচিয়ায় ২৭৯.৫ কিলোওয়াট, মনপুরায় ২১৮.৪ কিলোওয়াট এবং উত্তর সাকুচিয়ায় ১৭৭ কিলোওয়াট। হাজিরহাট ইউনিয়নের ৯০০ গ্রাহককে ওজোপাডিকোর ডিজেল জেনারেটর দিয়ে সরকারি মূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের ২০২২ সালের নির্দেশনা মোতাবেক উক্ত মিনিগ্রিডের আওতাধীন গ্রাহকরা সরকারি মূল্যে বিদ্যুৎ সুবিধা পাবেন। মনপুরায় ৩ মেগাওয়াট (এসি) সোলার-ব্যাটারি-ডিজেল হাইব্রিড বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে মিনিগ্রিডগুলো ওজোপাডিকোর নেটওয়ার্কের সঙ্গে গ্রিড-টাইড সিস্টেমে পরিচালিত হবে এবং গ্রাহকরা ওজোপাডিকোর আওতাধীন হবেন।
