তাঁর পুরো নাম খলিল উল্লাহ খান। তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তিনি একজন শক্তিশালী অভিনেতা খলিল নামেই সুপরিচিত।
১৯৬২ সালে ‘সোনার কাজল’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করেন। এর আগে তিনি মঞ্চে অভিনয় করেছেন। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মঞ্চ ও টিভি নাটকে অভিনয় করে তিনি সুপরিচিত হন।
ফিল্মে আসার আগে বেশ কয়েকটি নাটকেও অভিনয় করেন। ফিল্মে আসার ব্যাপারে প্রযোজক মাসুদ চৌধুরীর কাছ থেকে সহযোগিতা পান।
তাঁর সাহযোগিতায় জহির রায়হান ও কলিম শরাফির ‘সোনার কাজল’ ছবিতে নায়ক হয়ে যান খলিল।
প্রথম ছবিতে দু’জন নায়িকা ছিলেন একজন সুমিতা দেবী, অপরজন সুলতানা জামান। খলিল অভিনীত দ্বিতীয় ছবি ‘প্রীত না জানে রীত’। ছবিটি ১৯৬৩ সালের ১৩ জানুয়ারি মুক্তি পায়।
খলিলের তৃতীয় ছবি ‘সঙ্গম’। এ ছবিতে খলিল ও সুমিতা দেবী ছিলেন রোমান্টিক নায়ক-নায়িকা।
১৯৬৫ সালে চুক্তিবদ্ধ হন ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী’ ছবিতে। ভাওয়াল রাজার ঐতিহাসিক কাহিনী অবলম্বনে এর চিত্রনাট্য লিখেছিলেন রওনক চৌধুরী।
ছবিতে ডাক্তার আশুর চরিত্রে ছিলেন খলিল। ছবিতে নায়িকা রেশমার সঙ্গে ছিল তাঁর পরকীয়া প্রেম। ভাওয়াল সন্ন্যাসীর পর ‘উলঝন’ ছবিতে খলিলের নায়িকা ছিলেন রোজী।
এরপর নায়ক হিসেবে তিনি একে একে অভিনয় করলেন ১৯৬৫ সালে কাজল, ক্যায়সে কঁহু, ১৯৬৬ সালে বেগানা, ১৯৬৮ সালে জংলী ফুল প্রভৃতি ছবিতে।
নায়ক হিসেবে খলিলের শেষ ছবি ‘জংলী ফুল’। এটি ১৯৬৮ সালের ২৯ মার্চ মুক্তি পায়। তাঁর নায়িকা ছিলেন সুলতানা জামান। সহনায়িকা ছিলেন সুচন্দা।
১৯৭৪ সালে ‘উৎসর্গ’ এবং ‘এখানে আকাশ নীল’ ছবি ২টির মাধ্যমে খলিল চরিত্রাভিনেতা রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। এস এম পারভেজ পরিচালিত 'বেগানা' ছবিতে প্রথম খলনায়ক হিসেবে অভিনয় করেন।
তাঁর অভিনীত ছবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো - পুনম কি রাত, ভাওয়াল সন্ন্যাসী, উলঝন, সমাপ্তি, তানসেন, নদের চাঁদ, পাগলা রাজা, বেঈমান, অলঙ্কার, মিন্টু আমার নাম, ফকির মজনু শাহ, কন্যাবদল, মেঘের পরে মেঘ, আয়না, মধুমতি, ওয়াদা, ভাই ভাই, বিনি সুতার মালা, সঙ্গম, সোনার কাজল, আলোর মিছিল, অশান্ত ঢেউ, কাজল, জংলী ফুল, বেগানা, সমাপ্তি, তানসেন, নদের চাঁদ, মাটির ঘর, পাগলা রাজা, অলংকার, মিন্টু আমার নাম, ফকির মজনু শাহ, কন্যাবদল, যৌতুক, সোনার চেয়ে দামি, মেঘের পর মেঘ, আয়না, মধুমতি, ওয়াদা, ভাই ভাই, বিনি সুতার মালা, মাটির পুতুল, সুখে থাকো, অভিযান, মাটির পুতুল, সুখে থাকো, অভিযান, কার বউ, আওয়াজ, নবাব, গুণ্ডা, পুনর্মিলন, বউ কথা কও, আওয়াজ, দ্বীপ কন্যা, সেতু, মনিহার প্রভৃতি।
একটি ছবি পরিচালনা ও দুটি ছবি প্রযোজনা করেছিলেন তিনি। পরিচালিত ছবি ‘ভাওয়াল সন্যাসী এবং প্রযোজিত ছবির একটি ‘সিপাহী’, অন্যটি ‘এই ঘর এই সংসার‘। সিপাহী ছবিটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন কাজী হায়াৎ। ছবিটি বেশ ভালো ব্যবসা করেছিল।
তিনি অসংখ্য টিভি নাটকে অভিনয় করেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের শুরু থেকেই এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি।
শহীদুল্লাহ কায়সারের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত আবদুল্লাহ আল মামুনের পরিচালনায় টিভি নাটক ‘সংশপ্তক’ এ ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততন্ত্রের প্রতীক ‘মিয়ার বেটা’ চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেন। তাঁর উচ্চারিত 'টাকা আমার চাই, নইলে জমি' সংলাপটি সে সময় টিভি দর্শকদের মুখে মুখে ফিরতো।
আট শ’রও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন। তবে একটিমাত্র ছবিতে অভিনয়ের জন্য বহু বছর আগে একবারই পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সেটি ছিল চিত্রনায়িকা কবরী প্রযোজিত আলমগীর কুমকুম পরিচালিত ‘গুণ্ডা’ ছবি।
অভিনয়ে গুরত্বপূর্ণ অবদানের কারণে একুশে পদক, ২০১২ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তিনি আজীবন সম্মাননা অর্জন করেছেন। তিনি একসময় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জন্ম সিলেটের কুমারপাড়ায় ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৪ সালে। তাঁর বাবা পুলিশ অফিসার ছিলেন বলে তাঁকে মেদিনীপুর, কৃষ্ণনগর, বগুড়া, বর্ধমান, নোয়াখালী যেতে হয়।
খলিলের শৈশব জীবন কেটেছিল এসব জেলাতেই।১৯৪৮ সালে তিনি সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৫১ সালে মদনমোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেন। সিলেট এমসি কলেজ থেকে তিনি স্নাতক পাস করেন।
১৯৫১ সালে আর্মি কমিশনে যোগ দিয়ে কোয়েটাতে চলে যান। ১৯৫২ সালে ফিরে এসে আনসার এ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে বয়সের কারণে রিটায়ার করেন আনসার ডিপার্টমেন্ট থেকে।
৭ ডিসেম্বর ২০১৪ সালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নিজ বাড়িতে বাংলা চলচ্চিত্রের শক্তিমান এই অভিনেতার জীবনাবসান ঘটে। শ্রদ্ধাঞ্জলি।