ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তার নির্বাচনি এলাকায় চলছে আনন্দ-উল্লাস।
এরইমধ্যে সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। মেয়র নির্বাচন করার ঘোষণা দেওয়ার পর ইশরাক সমর্থকরা আরও উচ্ছ্বসিত হয়েছেন।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) পুরান ঢাকার অলিগলি ঘুরে দেখা যায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ঘরে ঘরে, জটলা বেধে বৈঠক করে, চায়ের দোকানগুলো মেয়র নির্বাচন নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ।
বংশাল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মামুন আহমেদ বলেন, ইশরাক হোসেন পুরান ঢাকার গর্ব। তাছাড়া রাজনৈতিকভাবে তার পারিবারিক ইতিহাস সমৃদ্ধ। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসন (সূত্রাপুর-কোতোয়ালি) থেকে বিএনপির মনোনয়নে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে হারিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে তাক লাগিয়ে দেন ইশরাকের বাবা সাদেক হোসেন খোকা। এ গৌরব শুধু বিএনপির নয়, পুরান ঢাকাসহ পুরো দেশের। তার হাত ধরে ঢাকা তথা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন হবে বলে প্রত্যাশা করি।
কোতোয়ালি থানা ৩৭ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. ফরহাদ রানা বলেন, জামাত-এনসিপি জোট কিংবা অন্যান্য প্রার্থীর সঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসার মতো একমাত্র যোগ্য প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। কেননা ইতিমধ্যে তিনি তা প্রমাণ করেছিলেন ২০২০ সালের নির্বাচনে এবং সেই নির্বাচনে পরিকল্পিতভাবে ফলাফল জালিয়াতির মাধ্যমে তাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এবার যদি তাকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের সুযোগ না দেওয়া হয়, তবে অন্য কোন দল থেকে মেয়র বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। কেননা তরুণ, মেধাবী এবং পরিশ্রমী নেতা হিসেবে তার মতো যোগ্য দ্বিতীয় কেউ নেই। তার বাবা সাদেক হোসেন খোকা অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সর্বশেষ মেয়র ছিলেন। মেয়র খোকা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নগরের সমস্যাগুলো স্থায়ী সমাধানে উন্নত শহর গুলোর আদলে নগর সরকার অথবা 'মেট্রোপলিটন গভর্নমেন্ট' এর পক্ষে সব সময় জোরালো অবস্থান নিয়ে এসেছিল। ঢাকা শহরকে বিশ্বের বুকে একটি মডেল শহর হিসেবে গড়ে তুলার নানাবিধ উন্নয়মূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন তিনি। তাই আমরা চাইব বাবার অসম্পূর্ণ কাজগুলো বাস্তবায়ন করার জন্যে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে মেয়র হিসেবে নির্বাচিত করা হোক। তাছাড়া বিদেশ থেকে আধুনিক প্রকৌশলী বিদ্যা কৃতিত্ত্বের সঙ্গে অর্জন করে আসার ফলে তার দ্বারাই সম্ভব হবে আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করা।
বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে ৭৮,৮৫০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। বর্তমান তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
বাবা সাদেক হোসেন খোকা এবং মা ইসমত আরার কোলজুড়ে ১৯৮৭ সালের ৫ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন ইশরাক হোসেন। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকারী ইশরাকের শৈশব ও কৈশোর রাজধানী ঢাকা শহরে কেটেছে। তিনি ঢাকার স্কলাস্টিকা স্কুল থেকে 'ও' লেভেল এবং 'এ' লেভেল সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারে ভর্তি হন। সেখানে তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১১ সালে পড়াশোনা শেষ করে তিনি কিছু সময় যুক্তরাজ্যে থেকে বিভিন্ন স্থানীয় মোটরগাড়ি সংস্থায় কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
ব্যক্তিগত জীবন
২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর পারিবারিকভাবে বাগদান সম্পন্ন হয়েছে ইশরাক হোসেনের। তার জীবনসঙ্গী ব্যারিস্টার নুসরাত খান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী পরিষদের সদস্য এবং টাঙ্গাইল জেলার সাবেক সংসদ সদস্য নুর মোহাম্মদ খানের বড় মেয়ে। ব্যারিস্টার নুসরাত টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ধুবরিয়া গ্রামের মেয়ে।
রাজনৈতিক অবস্থান
ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রেই রয়েছে তার বাবা, সাবেক মন্ত্রী ও ঢাকার (অবিভক্ত) মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। ছোট বেলা থেকে বাবার হাতেই তার রাজনৈতিক হাতেখড়ি। তিনি তার পিতার রাজনৈতিক আদর্শ অনুসরণ করে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তিনি বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম দলের আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডনে থাকাকালীন যুক্তরাজ্য শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার বাবা সাদেক হোসেন খোকা ২০০১ সালের নির্বাচনে ঢাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি খালেদা জিয়া সরকারের মৎস্য মন্ত্রী ছিলেন। এর আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি শেখ হাসিনাকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য হন এবং একই সরকারের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে ২০০২ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ছাত্ররাজনীতি, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন ও বিএনপির সাংগঠনিক বিস্তারে সাদেক হোসেন খোকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কারাবরণ ও রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে চিহ্নিত তার জীবন বিএনপির রাজনীতিতে বিশেষভাবে মূল্যায়িত। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু দলটির জন্য বড় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সংগ্রামী রাজনৈতিক পরিবেশেই বেড়ে ওঠেন ইশরাক হোসেন। পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় তিনি ছাত্রজীবন থেকেই বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ঢাকার স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে থাকেন। বাবার মৃত্যুর পর ইশরাক হোসেন বিএনপির নগর রাজনীতিতে আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে পুরান ঢাকার সাংগঠনিক ভিত্তিতে তার সক্রিয়তা তাকে তরুণ নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি দেয়।
এ বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন বলেন, রাজনীতির প্রেরণা আমার বাবা, যিনি তার রোল মডেল এবং হিরো। যেভাবে তিনি জনগণের পাশে ছিলেন, আমার জীবন জনগণের সেবা এবং দেশের কল্যাণে সেভাবে উৎসর্গ করতে চাই। প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই মন্ত্রিসভায় দেশের সেবা করার সুযোগ পাওয়া আমার জন্য বড় সম্মানের। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতো একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ দফতরে তরুণদের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা রক্ষা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস পৌঁছে দেওয়াই হবে আমার প্রধান লক্ষ্য। তাছাড়া ঢাকা শহরের ৪০০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময়ের অবিভক্ত ঢাকার মেয়র ছিলেন আমার বাবা।
তিনি বলেন, আমি নিজেও ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপসকে প্রায় পৌনে ২ লাখ ভোটে পরাজিত করা সত্ত্বেও দায়িত্ব গ্রহণ সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যৎ যদি সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব পাই তবে আমার বাবার মতোই উন্নয়নমূলক কাজ করব। আমার বাবা ২০০২ সালের মে মাসে মেয়র হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের দেনা ছিল ৬৩১ কোটি টাকা। নভেম্বর ২০১১ সালে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার সময় সকল উন্নয়ন কর্মকান্ড ও অন্যান্য ব্যয় মিটিয়ে তহবিলের মজুদ ছিল ৩ কোটি ৪৭ লক্ষ টাকা। মেয়র খোকা একক ঢাকার নগরপিতা ছিলেন এবং এর প্রতিটি আনাচে-কানাচে অগণিত কবরস্থান, মসজিদ, এতিমখানা, স্কুল, খেলার মাঠ, ফুটপাত, রাস্তা প্রশস্তকরণ, বহু এলাকায় ব্যায়ামাগারসহ কমিউনিটি সেন্টার স্থাপন করেন। আলোকিত করেন অন্ধকারাচ্ছন্ন সকল রাস্তা-ঘাট।
-1772014423.jpg)