বুধবার, জুন ১৭, ২০২৬
 শিরোনাম
মধ্যপ্রাচ্যে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির হামলা সুনামগঞ্জ-এর ছাতক থানা পুলিশের অভিযানে নিয়মিত মামলার ৩ আসামি গ্রেফতার শাহ আমানত বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ ফ্লাইট বাতিল এনসিপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, দেশজুড়ে কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি-টহল প্রতিমন্ত্রী হয়ে নিজ এলাকায় নুরুল হক ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এলাকা ছাড়ার হুঁশিয়ারি: টেকনাফে এমপি শাহজাহান চৌধুরী নগরবাসীর নিরাপত্তায় মধ্যরাতে রাস্তায় আইজিপি: আকস্মিক পরিদর্শনে কড়া বার্তা পাকিস্তান সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা, কাবুল-কান্দাহারে পাল্টা হামলা ফোন করে জামায়াত আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

এক পরিবারে তিন দলের তিন শীর্ষ নেতা

এক পরিবারে তিন দলের তিন শীর্ষ নেতা

এক পরিবারে তিন দলের তিন শীর্ষ নেতা


তিন আপন সহোদর ভাই তিনটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। কেবল যুক্তই না, রয়েছেন মূল ধারার পদ-পদবীতে।

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে একেই পরিবারের আপন তিন সহোদর ভাই রয়েছে তিনটি দলের মুল ধারার নেতৃত্বে,কেউ রাজনৈতিক দলে,কেউ আবার অঙ্গ সংগঠনের নেতৃত্বে। ক্ষমতার পালাবদল কখনোই তাদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়নি। প্রতিটি রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা থেকেছেন সুবিধাজনক অবস্থানে। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, রাজনৈতিক,সামাজিক ও প্রশাসনিক সুবিধা হাতছাড়া  হয় না তাঁদের- এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের এই তিন সহোদরকে নিয়ে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গণে এখন নানা কথাবার্তা ও আলোচনা-সমালোচনা চলছে। 
 

উপজেলা সদরের চরপাড়া গ্রামের এই পরিবারের বড় ছেলে মোশাররফ হোসেন করিমগঞ্জ উপজেলা যুবদলের বর্তমান আহ্বায়ক। মেজোভাই মোবারক হোসেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উপজেলা সমন্বয় কমিটির সভাপতি। আর ছোট ভাই মিজানুর রহমান মিজান করিমগঞ্জ পৌর যুবলীগের সভাপতি। 
বিষয়টিকে তিন ভাইয়ের ‘রাজনৈতিক কূটকৌশল’ হিসেবে কেউ কেউ দেখছেন। আবার অনেকে মনে করেন,এটি ‘রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতার একটি বিরল দৃষ্টান্ত’। তাদের দাবি, ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ে অবস্থান নেওয়ার কারণে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, পরিবারটির প্রভাব ও সুবিধা নিশ্চিত থেকেছে।
 

ফরিদ মিয়া নামে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের  এক নেতা বলেন,মিজানুর রহমান বর্তমানে যুবলীগ নেতা। আওয়ামী লীগের পতনের পর উপজেলার কয়েক শত যুবলীগ,ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। যাদের নামে মামলা হয়নি, তারাও পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু মিজান যুবলীগের অন্যতম নেতা হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। তিনি প্রকাশ্যেই ঘুরাফেরা করেন। কিন্তু আমরা পারি না। আমি মনে করি,তাঁর দুই ভাই যুবদল ও এনসিপির নেতা হওয়ায় তাঁকে কোনো মামলায় আসামি করা হয়নি। একইভাবে আওয়ামী লীগের সময় যুবদল নেতা মোশাররফ হোসেন ছোটভাই যুবলীগ নেতা মিজানের সুরক্ষা উপভোগ করেছেন। আওয়ামী লীগের লোকজনও তখন তাঁকে সমীহ করত।
 

জানা গেছে,মোশাররফ হোসেন পেশায় আইনজীবী। তিনি ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত। পাশাপাশি বর্তমানে তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
 

স্থানীয়রা জানায়, গণ-আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছোট ভাই মোবারক হোসেন এনসিপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং উপজেলা সমন্বয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পান। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দুই বছর তাঁর প্রভাব ও তৎপরতার কারণে উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশও চাপের মধ্যে কাজ করেছে।
 

একজন বিএনপি-ঘনিষ্ঠ আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,ডাঃ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ছোট ভাই এনসিপি নেতা মোবারক হোসেনের প্রভাব ও তৎপরতায় মোশাররফ হোসেন পিপি পদে নিয়োগ পান। জেলা বিএনপি থেকে যাদের নাম পাঠানো হয়েছিল,তাদের কাউকে পিপি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এখন নতুন করে পিপি নিয়োগের তোড়জোড় চলছে। তিনি আবারও পিপি পদে নিয়োগ পেতে বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে লবিং করছেন।
 

কিশোরগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ও জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী  ফোরামের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন,ওরা তিনভাই যে তিন দলের নেতা এটা সবাই জানে। এসব নিয়ে আড়ালে আবডালে অনেক কথা হয়। তবে পিপি,জিপি,এপিপি নিয়োগের সময় বিএনপি থেকে যাদের নাম পিপি হিসেবে আইন মন্ত্রাণালয়ে পাঠানো হয়েছিল,সেই তালিকায় মোশাররফের নাম ছিল না। বিএনপির তালিকা থেকে পিপি হিসেবে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,  তাঁদের প্রয়াত বাবা জহিরুল হক মেম্বার কখনো আওয়ামী লীগ,কখনো বা জাতীয় পার্টি করেছেন। এই দুই দলের এমপিদের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর যোগাযোগ। দলীয় কোনো পদ-পদবী না থাকলেও ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে তিনি উপজেলায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। 
 

এসব বিষয়ে করিমগঞ্জ উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হলে তাঁরা তিন ভাই যে তিনটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষপদে রায়েছেন তা স্বীকার করে বলেন, প্রকৃতপক্ষে আমরা তিন ভাই হলেও সবাই পৃথক। তবে আমি মাঝেমাঝে ছোটভাইদের এসব বিষয়ে বলেছি, কিন্তু ওরা যদি কথা না শুনে, তাহলে তো করার কিছু নেই। প্রয়াত বাবার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাবা আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতি করেছেন। কিন্তু কোনো পদ-পদবীতে ছিলেন না। মেজোভাই এনসিপি নেতা মোবারক হোসেনের প্রভাবে পিপি পদে নিয়োগের বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন,এসব নিয়ে দলে বিভক্তি ছিল। আমরা আমাদের মতো চেষ্টা করেছি। অন্যরা অন্যদের মতো চেষ্টা করেছে। আমি নিজে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে দেখা করেছি। জোরালো চেষ্টা তদবিরের কারণে আমি নিয়োগ পেয়েছি। 
 

যুবলীগ নেতা মিজানুর রহমান মিজানের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন,সবারই যেকোনো রাজনৈতিক দল করার স্বাধীনতা রয়েছে। আমি আওয়ামী লীগের আদর্শ বিশ্বাস করি তাই যুবলীগের নেতৃত্ব দিচ্ছি। তিনি বলেন,আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বরং আওয়ামী লীগের কেউ কেউ চেয়েছে বা চেষ্টা করেছে আমি যেন মামলার আসামি হই। কিন্তু আমাকে কোনো মামলায় আসামি করা হয়নি। এটা বড়ভাই যুবদল নেতার অবদান কি-না,এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভিন্ন রাজনীতি করলেও দিনশেষে তো আমরা ভাই। কাজেই ভাইয়ের অবদান অস্বীকার করবো না। 
এ বিষয়ে মোজোভাই এনসিপি নেতা মোবারক হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা হলে তাঁর ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।     
 

বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী অভিযোগ করেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আবারও সক্রিয় ও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন যুবদল নেতা মোশাররফ হোসেন। তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক বলয়ের সুবিধা ভোগ করছেন যুবলীগ ও এনসিপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তাঁর অন্য দুই ভাইও। বিষয়টি বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ভালো চোখে দেখছে না।

 

মোঃ-মাহ্ফুজুল হক খান (জিকু) 

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি।