মদনমোহন কোহলি যিনি সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে মদন মোহন নামেই অধিক পরিচিত, ছিলেন হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম সুরেলা, সংবেদনশীল ও নন্দিত সঙ্গীত পরিচালক। বিশেষত গজলভিত্তিক চলচ্চিত্রসঙ্গীতে তাঁর অবদান তাঁকে ভারতীয় সঙ্গীত ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। লতা মঙ্গেশকর তাঁকে স্নেহভরে আখ্যায়িত করেছিলেন— “গজল কা শেহজাদা” (গজলের যুবরাজ)।
১৯২৪ সালের ২৫ জুন ইরাকের বাগদাদে তাঁর জন্ম। পিতা রায় বাহাদুর চুনিলাল কোহলি সেখানে পুলিশ বিভাগের হিসাবরক্ষক জেনারেল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে পরিবার ভারতের পাঞ্জাবের চাকওয়ালে ফিরে আসে। লাহোর ও মুম্বাইয়ে তাঁর শিক্ষা জীবন অতিবাহিত হয়। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাথমিক শিক্ষা নিলেও তিনি কখনোই আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেননি।
১৯৪৬ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিও, লখনউ-এ প্রোগ্রাম সহকারী হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে তিনি ওস্তাদ ফৈয়াজ খান, আলী আকবর খান, বেগম আখতার ও তালাত মাহমুদের মতো কিংবদন্তিদের সান্নিধ্য লাভ করেন। এই সময় থেকেই সুরসৃষ্টি ও গজলের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে।
১৯৫০ সালে ‘আঁখেন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে স্বাধীন সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর ‘আদা’, ‘ওহ কৌন থি’, ‘মেরা সায়া’, ‘হকিকত’, ‘দস্তক’, ‘হীর রাঞ্ঝা’, ‘মৌসম’, ‘দুলহন এক রাত কি’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তিনি অমর সব সুর উপহার দেন।
তাঁর সুরে অমর হয়ে আছে—
* “লাগ যা গলে”
* “নয়না বরসে রিমঝিম রিমঝিম”
* “আপ কি নজরোঁ নে সমঝা”
* “তেরি আঁখোঁ কে সিবা”
* “ইয়ে দুনিয়া ইয়ে মেহফিল”
* “ফির ওহি শাম, ওহি গম”
* “মেরি আওয়াজ সুনো”
* “কার চলে হাম ফিদা”
* “রসম-ই-উলফত কো নিবহায়েঁ তো নিবহায়েঁ ক্যায়সে”
লতা, রফি ও তালাতের সঙ্গে অনন্য জুটি-
লতা মঙ্গেশকর, মোহাম্মদ রফি, তালাত মাহমুদ, মান্না দে এবং পরবর্তীকালে কিশোর কুমারের কণ্ঠে মদন মোহনের সুর যেন এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। লতা মঙ্গেশকর একাধিকবার স্বীকার করেছেন যে মদন মোহনের সুরগুলো গাওয়া ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু একই সঙ্গে অপূর্ব সৌন্দর্যমণ্ডিত।
১৯৭০ সালের ‘দস্তক’ চলচ্চিত্রের সঙ্গীতের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালকের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। জীবদ্দশায় প্রাপ্য স্বীকৃতি পুরোপুরি না পেলেও মৃত্যুর পর তাঁর সৃষ্টির মহিমা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
দীর্ঘ সংগ্রাম, অবহেলা ও মানসিক চাপের প্রভাব তাঁর ব্যক্তিজীবনে পড়ে। অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই মাত্র ৫১ বছর বয়সে তিনি পরলোকগমন করেন।
২০০৪ সালে যশ চোপড়ার ‘বীর-জারা’ চলচ্চিত্রে তাঁর অব্যবহৃত ১১টি সুর পুনরায় বিন্যস্ত করেন তাঁর পুত্র সঞ্জীব কোহলি। জাভেদ আখতারের গীতরচনা ও লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে সেই গানগুলো আবারও প্রমাণ করে— মদন মোহনের সুর কখনো পুরোনো হয় না।
আজ তাঁর ১০২তম জন্মজয়ন্তীতে ভারতীয় চলচ্চিত্রসঙ্গীতের এই মহান সুরকারকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, মদন মোহন
আপনার সুর বেঁচে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।