গাজীপুরের শ্রীপুরে এক নারী শ্রমিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তৈরি পোশাক খাতে হঠাৎ যে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে, তার নেপথ্যে গভীর কোনো ‘ব্লুপ্রিন্ট’ বা পূর্বপরিকল্পনা রয়েছে কি না,সে প্রশ্ন এখন চাউর হয়েছে। ঘটনার দিন মূল কারখানায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও, সেই মৃত্যুকে পুঁজি করে দুই কিলোমিটার এলাকার অন্তত ৫-৬টি কারখানায় ব্যাপক ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হামলাকারীদের একটি বড় অংশই শিশু, কিশোর ও হাফপ্যান্ট পরিহিত যুবক। যাদের কারো গলায় বা পরনে কারখানার কোনো পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) ছিল না।
শিল্পাঞ্চল সংশ্লিষ্ট মহল ও শিল্প পুলিশের ধারণা, দেশের তৈরি পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করতে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের (বায়ার) কাছে নেতিবাচক বার্তা দিতেই সাধারণ শ্রমিকদের আবেগ ও আন্দোলনকে ব্যবহার করেছে একটি বহিরাগত চক্র।উপজেলার টেপিরবাড়ী কালার অ্যান্ড কোং কারখানায় নারী শ্রমিকের মৃত্যু।
শ্রমিকদের দাবি, সেখানে আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, কোনো ভাঙচুর হয়নি। মূল স্পট থেকে ২ কিমি দূরে ৫-৬টি কারখানায় ধারাবাহিক ভাবে তাণ্ডব। সিসিটিভি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিও ফুটেজে হাফপ্যান্ট ও লুঙ্গি পরা একঝাঁক শিশু-কিশোর ও বহিরাগত যুবকদের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শ্রীপুরের টেপিরবাড়ী এলাকায় অবস্থিত ‘কালার অ্যান্ড কোং লিমিটেড’ কারখানায় এক নারী শ্রমিকের মৃত্যুর পর সেখানে কর্মরত শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানান। তবে রহস্যজনকভাবে এই ঘটনার জের ধরে দুই কিলোমিটার দূরে মাওনা চৌরাস্তা ও কেওয়া এলাকায় অবস্থিত একাধিক কারখানায় একযোগে হামলা চালানো হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্রীপুর পৌরসভার সাততলা এমএইচসি এ্যাপারেলস লিমিটেড, পারটেক্স গ্রুপের ট্রিপল এ্যাপারেলস লিমিটেড, লিফ গ্রেড ক্যাজুয়েলওয়ার লিমিটেড এবং মাওনা চৌরাস্তায় অবস্থিত নোমান ইউভিং মিলস লিমিটেড ও ইয়াসমিন স্পিনিং মিলস লিমিটেড।
ভাইরাল হওয়া ভিডিও ও ছবি টেপিরবাড়ী কালার অ্যান্ড কোং কারখানার সাধারণ শ্রমিকদের দেখানো হলে তারা স্পষ্ট জানান, ভাঙচুরকারীদের কাউকেই তারা চেনেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শ্রমিক বলেন, "আমাদের কারখানায় ঘটনা ঘটেছে, আমরা শান্ত ছিলাম। কিন্তু দুই কিলোমিটার দূরের কারখানায় কারা ভাঙচুর করলো? এরা নিশ্চিতভাবেই পরিকল্পিতভাবে বাইরে থেকে আসা বহিরাগত।"
পৌরসভার এমএইচসি এ্যাপারেলস লিমিটেড কারখানার সামনের একাধিক দোকানদার জানান, হঠাৎ কয়েক শ’ অপরিচিত অল্প বয়সী তরুণ লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে কারখানার শ্রমিকবাহী দুটি বাসে ভাঙচুর চালায়। এরপর গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে শিপমেন্টের জন্য তৈরি দুটি ট্রাক এবং একটি প্রাইভেটকার ক্ষতিগ্রস্ত করে। ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাকের চালক গিয়াস উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "অডিটের জন্য শিপমেন্টের গাড়ি লোড করে রেখেছিলাম। ৩০-৪০ হাজার টাকার ক্ষতি হলো, এই ক্ষতিপূরণ এখন কে দেবে?"
এদিকে পারটেক্স গ্রুপের ট্রিপল এ্যাপারেলস লিমিটেডের এক কর্মকর্তা জানান, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে হামলার আগে ব্লুপ্লানেট কালার কারখানার কিছু আইডি কার্ডধারী মানুষের পাশাপাশি লুঙ্গি পরা বয়স্ক মানুষ এবং হাফপ্যান্ট পরা যুবকেরা দাঁড়িয়ে ছিল। এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হামলা। তারা ইতিমধ্যে ভিডিও ফুটেজ নিয়ে কাজ করছেন এবং পুলিশকে অবহিত করেছেন এবং পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় ঘটনার সময় তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে আটক করা হয়নি। তবে দুপুর দেড়টার দিকে কেওয়া বাজার এলাকা থেকে আসা দেড় শতাধিক লোকের একটি মিছিল যখন মাওনা চৌরাস্তায় নোমান ইউভিং মিলস ও ইয়াসমিন স্পিনিং মিলসে ভাঙচুর শুরু করে, তখন পুলিশ কঠোর অ্যাকশনে যায় এবং হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
শিল্প পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান,"শ্রমিকেরা সাধারণত এক জায়গার ঘটনার জেরে অন্য কারখানায় গিয়ে ভাঙচুর করে না। মিছিলে অংশ নেওয়াদের বেশিরভাগই ছিল শিশু, কিশোর ও অননুমোদিত যুবক। আমাদের ধারণা, একটি মহল কারখানায় নারী শ্রমিক ছুটি না পেয়ে মারা যাওয়ার মিথ্যা অজুহাত তুলে আন্তর্জাতিক বায়ারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার এবং খাতটিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছিল।
এ বিষয়ে শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনুর আলম জানান, ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। হামলা ও ভাঙচুরে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের পরিচয় শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ ইসলাম ভূঞা বলেন, "কারখানা ভাঙচুর ও হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে থানা পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
তৈরি পোশাক শিল্পের মালিক ও সচেতন মহল মনে করছেন, সাধারণ শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনকে পুঁজি করে যারা দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে চায়, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সেই ‘নেপথ্যের কারিগরদের’ মুখোশ উন্মোচন করা এখনই জরুরি।
শ্রীপুর(গাজীপুর)প্রতিনিধি:
