আজ ৩ জুলাই। ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা রাজ কুমার-এর ৩০তম প্রয়াণবার্ষিকী। অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, গম্ভীর কণ্ঠস্বর, অনন্য সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং রাজকীয় উপস্থিতির জন্য তিনি আজও ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অভিনেতা হিসেবে বিবেচিত।
কুলভূষণ পণ্ডিত নাম নিয়ে ১৯২৬ সালের ৮ অক্টোবর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেলুচিস্তানের লোরেলাইয়ে (বর্তমান পাকিস্তান) এক কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারে তাঁর জন্ম। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি মুম্বাই পুলিশের একজন উপ-পরিদর্শক (Sub-Inspector) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু অভিনয়ের প্রতি প্রবল আকর্ষণ তাঁকে শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রজগতে নিয়ে আসে।
১৯৫২ সালে 'রঙ্গিলি' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা। প্রথমদিকে কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করলেও প্রকৃত পরিচিতি আসে ১৯৫৭ সালে সোহরাব মোদী পরিচালিত 'নওশেরওয়ান-ই-আদিল' চলচ্চিত্রে। একই বছর 'মাদার ইন্ডিয়া'-তে নার্গিস-এর স্বামীর চরিত্রে তাঁর সংক্ষিপ্ত অথচ হৃদয়স্পর্শী অভিনয় তাঁকে সর্বভারতীয় দর্শকের কাছে পরিচিত করে তোলে। পরবর্তীকালে এই চলচ্চিত্রটি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস (অস্কার)-এ সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন লাভ করে এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে ওঠে।
চার দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে তিনি ৭০টিরও বেশি হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- পয়গম (১৯৫৯)
- উজালা (১৯৫৯)
- দিল এক মন্দির (১৯৬৩) — এই ছবিতে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর অসাধারণ চরিত্রায়ণের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার অর্জন করেন।
- ওয়াক্ত (১৯৬৫)
- হামরাজ (১৯৬৭)
- হীর রাঞ্জা (১৯৭০)
- মর্যাদা (১৯৭১)
- লাল পাথর (১৯৭১)
- পাকিজা (১৯৭২)
- কুদরত (১৯৮১)
- মরতে দম তক (১৯৮৭)
- জঙ্গবাজ (১৯৮৯)
- সওদাগর (১৯৯১) — যেখানে দীর্ঘ ৩২ বছর পর আবারও তিনি কিংবদন্তি দিলীপ কুমার-এর সঙ্গে পর্দা ভাগ করেন।
- তিরঙ্গা (১৯৯২) — তাঁর শেষ দিকের অন্যতম জনপ্রিয় চলচ্চিত্র।
- গড অ্যান্ড গান (১৯৯৫) — তাঁর অভিনীত সর্বশেষ চলচ্চিত্র।
রাজ কুমার ছিলেন এমন একজন অভিনেতা, যাঁর সংলাপ বলার ধরন ছিল একেবারেই স্বতন্ত্র। তাঁর গভীর, ভারী কণ্ঠ, আত্মবিশ্বাসী অভিব্যক্তি এবং তীক্ষ্ণ সংলাপ উচ্চারণ তাঁকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে তুলেছিল। তাঁর অনেক সংলাপ আজও ভারতীয় সিনেমাপ্রেমীদের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বিমানসেবিকা জেনিফার-কে বিয়ে করেন। বিবাহের পর তিনি হিন্দু ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসারে নিজের নাম পরিবর্তন করে গায়ত্রী রাখেন। তাঁদের তিন সন্তান—পুরুরাজ কুমার, পানিনী রাজকুমার এবং কন্যা বাস্তবিকতা পণ্ডিত।
জীবনের শেষদিকে তিনি দীর্ঘদিন ক্যান্সারে ভুগছিলেন। ১৯৯৬ সালের ৩ জুলাই, মাত্র ৬৯ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যু ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে থাকে।
রাজ কুমার শুধু একজন সফল অভিনেতাই নন, তিনি ছিলেন ব্যক্তিত্ব, সংলাপ ও অভিনয়শৈলীর এক অনন্য বিদ্যালয়। তাঁর অভিনয় আজও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
৩০-তম প্রয়াণবার্ষিকীতে কিংবদন্তি অভিনেতা রাজ কুমারকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। আপনার শিল্প, আপনার ব্যক্তিত্ব এবং আপনার স্মরণীয় সংলাপ যুগ যুগ ধরে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকবে।