শীতের আমেজে চাঙ্গা চট্টগ্রামের শুঁটকি পল্লী: জমে উঠেছে কোটি টাকার ব্যবসা
শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গেই চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি পল্লীগুলোতে শুরু হয়েছে পুরোদমে শুঁটকি তৈরির উৎসব। কর্ণফুলী নদীর দুই তীর এবং সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক উপায়ে চলছে মাছ শুকানোর এই কর্মযজ্ঞ। শীতকালীন অনুকূল আবহাওয়া ও বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকায় এ সময়ে শুঁটকি উৎপাদনের ধুম পড়ে, যা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
উৎপাদনের পরিধি ও স্পটসমূহ:
নগরীর কর্ণফুলী নদীর উত্তর ও দক্ষিণ তীরঘেঁষা বাকলিয়া, ইছানগর, ডাঙ্গারচর, কর্ণফুলী ঘাট, ফিসারি ঘাট, চাক্তাই এবং রাজাখাল তীর এলাকায় বৃহৎ পরিসরে চলছে এই কার্যক্রম। এখানকার শতাধিক স্পটে প্রতিদিন সূর্যের আলোতে ছোট-বড় ২০ থেকে ২৫ প্রজাতির মাছ শুকানো হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, বছরের ১০ মাস শুঁটকি উৎপাদিত হলেও নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত শীতের এই ৫ মাসেই মূলত মূল মৌসুম ধরা হয়। এ সময় উৎপাদন ও চাহিদা দুটোই সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে।
প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বৈচিত্র্য:
সরেজমিনে দেখা যায়, শুঁটকি পল্লীগুলোতে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয় এই প্রক্রিয়া। প্রথমে মাছের পেট থেকে নাড়ি-ভুঁড়ি পরিষ্কার করা হয়, এরপর ধুয়ে নেওয়া হয় নির্দিষ্ট নিয়মে। প্রকারভেদে মাছগুলো রোদে শুকানোর জন্য বাঁশের তৈরি 'চাঙ' বা 'মাচাঙ'-এ বিছিয়ে দেওয়া হয়। আকার ও জাতভেদে মাছ শুকাতে এক থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে।
বর্তমানে বাজারে ছুরি, ফাঁইস্যা, লইট্টা, লাক্ষ্যা, কোরাল, রূপচাঁদা, পোয়া এবং বিভিন্ন মিশ্র জাতের শুঁটকির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ব্যবসায়ীদের দাবি, এখানকার শুঁটকির অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো-কোনো ধরনের ফরমালিন বা ক্ষতিকর রাসায়নিক মেডিসিন ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে এগুলো প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য: চট্টগ্রাম শুটকি উৎপাদন ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি আজগর হোসেন জানান, প্রতি মৌসুমে এখানে কোটি কোটি টাকার শুঁটকি বেচাকেনা হয়। শীত মৌসুমে চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ভালো লাভের আশা করছেন। একই সঙ্গে সরকারিভাবে একটি সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক শুঁটকিপল্লী গড়ে তোলা হলে এই খাত আরও বেশি গতিশীল হতো বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।আছদগঞ্জের মেসার্স আলমগীর ব্রাদার্সে মালিক বলেন, শীতকালে শুঁটকির সুস্বাদু পদের চাহিদা বাড়ে, ফলে উৎপাদনের এই সময়ে দামও কিছুটা নাগালের মধ্যে থাকে।
কর্ণফুলী থানার চরপাথরঘাটা এলাকার ইছানগর ও ডাঙ্গারচর গ্রামে শুঁটকি উৎপাদনের সাথে জড়িত শেখ আহমদ, কালা মিয়া,সাথে কথা বলে জানা যায় মাছধরা ট্রলারগুলোতে অগ্রিম লগ্নি করে হাঙ্গর সংগ্রহ করা হয়।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতামত:
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন-একসময় চট্টগ্রামে শুঁটকি ভালো উৎপাদন হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জেলেদের জালে বেশি মাছ ধরা না পড়ায় শুঁটকি উৎপাদনের পরিমানটা কিছুটা কমে এসেছে।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) চট্টগ্রাম মৎস্য বন্দরের মহাব্যবস্থাপক কমান্ডার মোহাম্মদ সাইফুর রহমান (জি), পিএসসি, বিএন-এ বিষয়ে গঠনমূলক মন্তব্য করে জানান, চট্টগ্রামের শুঁটকি কেবল একটি স্থানীয় খাদ্যপণ্য নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির ও অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিরাপদ ও ফরমালিনমুক্ত পদ্ধতিতে উৎপাদিত হওয়ায় এর কদর দেশজুড়ে। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত অবকাঠামো এবং বিপণনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় অর্থনীতিতে এটি আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
শীতের আমেজে কর্ণফুলী তীরের এই কর্মচাঞ্চল্য এখন পুরো চট্টগ্রামজুড়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। নিরাপদ ও মানসম্মত শুঁটকি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী খাতটি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করবে-এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সকলের।
মোঃ কামাল উদ্দিন চট্টগ্রাম দক্ষিণ বিশেষ প্রতিনিধি।
